আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের আরেকটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
হরমুজ প্রণালী পুনরায় না খুললে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি অগ্রাহ্য করেই নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছে তেহরান।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে সম্ভাব্য একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব বিবেচনায় থাকলেও ট্রাম্প এখনো কোনো খসড়া চুক্তিতে অনুমোদন দেননি।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি বহু ধারণার একটি, এবং প্রেসিডেন্ট এখনো এতে সই করেননি।’ ট্রাম্প বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প ইরানকে বুধবার শূন্য জিএমটি সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, নচেৎ সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দিয়েছেন।
রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ভাষায় তিনি বলেন, ‘প্রণালী খুলে দাও, নইলে তোমরা নরকে বাস করবে।’
ইরান এই হুমকি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ততদিন যুদ্ধ চলবে।
হামলা ও পাল্টা হামলা
ইসরাইলের হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান অঞ্চলজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং আরও ‘বিধ্বংসী’ হামলার হুমকি দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে এবং বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
রেভল্যুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না’।
পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা
সোমবার ইসরাইল জানায়, তারা ইরানের উপসাগরীয় উপকূলের আসালুয়েহ অঞ্চলে অবস্থিত বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যেখানে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের ন্যাশনাল পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেন, এই স্থাপনাটি ইরানের মোট পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের প্রায় ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে, যার মূল্য ‘দশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি’।
এছাড়া শিরাজের কাছে আরেকটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সেও হামলা হয়েছে, যেখানে ‘সামান্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)’র প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এক হামলা কেন্দ্রটির সীমানা থেকে মাত্র ৭৫ মিটার দূরে আঘাত হেনেছে।
কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, তাদের গোয়েন্দা প্রধান মাজিদ খাদেমি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘যে আমাদের ক্ষতি করতে চায়, আমরা তার নাগাল পাব।’
ইসরাইলি সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, তারা কুদস ফোর্সের বিশেষ অপারেশন ইউনিটের কমান্ডার আসগর বাঘেরিকেও হত্যা করেছে, যিনি বিশ্বজুড়ে ইসরাইলি ও মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা
সহিংসতা বাড়লেও যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আভাস পাওয়া গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পাকিস্তান, মিশর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি জানিয়েছেন, তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করছেন।
তবে ইরান বারবার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের সঙ্গে কোনো আলোচনায় নেই।
বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্বজুড়ে তেল সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলে। ইন্দোনেশিয়া জেট ফুয়েলে অতিরিক্ত চার্জ বাড়িয়েছে, আর এয়ার এশিয়া এক্স টিকিটের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বিকল্প পথে তেল আনবে, আর তাইওয়ানও একই পথ ব্যবহার করবে।
অঞ্চলজুড়ে বিস্তার
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতে আবাসিক এলাকায় হামলায় ছয়জন আহত হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করছে এবং আবুধাবির একটি শিল্প এলাকায় একজন আহত হয়েছে।
ইরান ইসরাইলে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হাইফায় একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত হয়েছে।
তেহরানেও একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে, এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পর রাজধানীর কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে লেবাননেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি হামলার পর বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে।