জাতির সংবাদ ডটকম।।
খেলাধুলা মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে না, বরং মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে এবং শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ শেখায় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল ইম্পেরিয়ালের মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’ এবং ‘ক্রীড়াই শক্তি, ক্রীড়াই বল’—এই চিরন্তন উক্তিগুলো আমাদের জীবনে খেলাধুলার অপরিহার্যতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো, জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে আসছি।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে, আর সুস্থ দেহ ও মন কাজের প্রতি আগ্রহ ও কর্মক্ষমতা বাড়ায়। দেহ ও মনকে সুস্থ রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, নিয়মিত খেলাধুলার মাধ্যমে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অর্জনের পাশাপাশি ভ্রাতৃত্ববোধ, সহমর্মিতা, নেতৃত্ব এবং দলগত কাজের গুণাবলি শেখে। এসব গুণ ভবিষ্যৎ জীবনে একজন মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশুদের বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা প্রসঙ্গে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের মূলে রয়েছে খেলাধুলা। খেলাধুলা শিশুদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বিকাশে সহায়তা করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন আর শিশুদের খেলার মাঠে খুব একটা দেখা যায় না। পড়াশোনার চাপ, কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষার কারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা বই ও স্ক্রিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের শিশুদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে যাওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না। অনেকের ধারণা, খেলাধুলা করে কোনো লাভ নেই। ফলে মোবাইল ফোনে গেম খেলা কিংবা টেলিভিশন দেখাকেই তারা বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছে। এভাবে স্মার্টফোন ও আকাশসংস্কৃতি ধীরে ধীরে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলছে।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আমরা স্কুল থেকে ফিরে বই রেখে সামান্য কিছু খেয়েই খেলার মাঠে ছুটে যেতাম। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ নানা খেলায় সময় কাটত। পরীক্ষার সময়েও এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং যারা খেলাধুলা থেকে দূরে ছিল, তাদের অনেককেই পরে জীবনে পিছিয়ে পড়তে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, একসময় প্রায় প্রতিটি স্কুল ও কলেজে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল বড় আয়োজন। যে প্রতিষ্ঠানে খেলা হতো, আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। মানুষ দল বেঁধে খেলাধুলা দেখতে আসত। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে কিছুটা আয়োজন থাকলেও শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ না থাকায় এসব আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে শহরের খেলার মাঠগুলো একের পর এক দখল ও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেই অনুপাতে খেলার মাঠ বাড়েনি। ফলে তরুণ ও যুবকেরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাঠের অভাবে খেলাধুলার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে খেলার জন্য স্টেডিয়াম তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের খেলাধুলার জন্য মাঠ নেই। অথচ ভালো খেলোয়াড় তৈরি হতে হলে ছোটবেলা থেকেই মাঠে খেলাধুলার সুযোগ থাকতে হয়। মাঠ ছাড়া পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মতো খেলোয়াড় তৈরি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বছরে দুই-চারটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা বিষয়টি চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের প্রভাষক পদে উন্নীত করার দাবি জানান তিনি।
বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল ফোন আসক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এখন মাঠের চেয়ে স্ক্রিনে বেশি সময় কাটাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ জাতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম মহসিন। সঞ্চালনা করেন খোকন শিকদার। আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবিএম রফিকুর রহমান, মশিউর রহমান সুমন, সজল ইসলাম ও শাহাদাত হোসেন।