ট্রান্সকম গ্রুপের বিপুল শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে

শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬


জাতির সংবাদ ডটকম।।

‎নিজের ভাইবোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে গোপনে ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রান্সকম গ্রুপের বিপুল শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে লতিফুর রহমানের কন্যা সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।


‎অভিযোগ অনুযায়ী, সিমিন রহমান জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রান্সকম গ্রুপের মোট ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার নিজের নামে স্থানান্তর করেন।
‎পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান গত ১১ জানুয়ারি এ মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। মঙ্গলবার আদালতে চার্জশিট উপস্থাপন করা হলে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. সেফাতুল্লাহ এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মনির হুসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

‎চার্জশিটে সিমিন রহমান ছাড়াও আরও পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক, মো. সামসুজ্জামান পাটোয়ারি এবং লতিফুর রহমানের স্ত্রী মিসেস শাহনাজ রহমান।

‎চার্জশিট অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় ট্রান্সকম গ্রুপের একটি বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে—এমন দেখিয়ে শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মিটিংয়ের এজেন্ডায় ছিল পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচারের অনুমোদন এবং লতিফুর রহমানের শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়টি। তবে তদন্তে উঠে এসেছে, ওই তারিখে আদৌ কোনো বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়নি।

‎তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হলেও আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়, অথচ তিনি ওই সময় কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন। কথিত বোর্ড মিটিংয়ের তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার বড় মেয়ে সিমিন রহমানের নামে এবং বাকি শেয়ার ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হকের নামে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেখানো হয়।

‎বাদীপক্ষের দাবি, এ ধরনের কোনো বোর্ড সভাই অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কোম্পানির বর্তমান পরিচালকদের কাছে সভার রেজুলেশন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হলেও আসামিপক্ষ কোনো কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। এমনকি বোর্ড মিটিংয়ের আগে ইমেইল বা ডাকযোগে পাঠানো কোনো নোটিসের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি।

‎চার্জশিটে আরও বলা হয়, শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৩ জুন শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হলেও নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা হয় বিলম্বে, ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর। এছাড়া শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা—কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। শুধু আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার সরাসরি লঙ্ঘন।

‎তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ভাইবোনদের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে সিমিন রহমান ‘ডিড অব সেটেলমেন্ট’সহ বিভিন্ন নথিপত্র তৈরি করেন। এ কাজে তিনি দুটি ভুয়া নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করেন, যেখানে বাবা, ভাই ও ছোট বোন শাযরেহ হকের স্ক্যান করা স্বাক্ষর সংযুক্ত করে ট্রান্সকমের অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে স্থানান্তরের দলিল প্রস্তুত করেন এবং তা আরজেএসসিতে দাখিল করেন।

‎ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ডাক বিভাগ ও জেলা প্রশাসকের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাযরেহ হকের নামে ব্যবহৃত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে তৈরি, যা ২০২০ সালের দলিলে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যে স্ট্যাম্প ভেন্ডরের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তার লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল হয়। ওই ভেন্ডর অবৈধভাবে ২০২৩ সালের স্ট্যাম্পকে ২০২০ সালের তারিখে সরবরাহ করেন।

‎উল্লেখ্য, ভাইবোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে লতিফুর রহমানের কন্যা শাযরেহ হক ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সিমিন রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। তদন্ত শেষে পিবিআইয়ের চার্জশিটে অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।