জাতির সংবাদ ডটকম।।
বাংলাদেশের তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়নে গুরুতর অনিয়ম ও আইন লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায়। গতকাল ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে “বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতার বাস্তবায়নের অবস্থা: গবেষণার ফলাফল প্রকাশ এবং প্রেস ব্রিফিং” শীর্ষক একটি অনুষ্ঠান গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্তন ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৈয়দ মাহফুজুল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএসটিআই-এর মেট্রোলজি বিভাগের ডেপুটি ডিরেক্টর আবদুল্লাহ আল মামুন, ভাইটাল স্ট্রাটেজিসের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, ঢাকা ও বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী ও প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ।
এছাড়াও বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল অ্যাডভোকেট (বিটিসিএ)-এর এক্সপার্ট মেম্বার আমিনুল ইসলাম সুজন, গ্রামবাংলা উন্নয়ন কমিটির নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাকসুদ, পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ, ডাস-এর টীম লিড আমিনুল ইসলাম বকুল, প্রমুখ।
টিসিআরসির প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিসিআরসির প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মোঃ বজলুর রহমান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসির প্রকল্প কর্মকর্তা মোঃ জুলহাস আহমেদ।
মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, গবেষণায় ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধনী ২০১৩)’ এর ধারা ১০ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে বাজারজাত তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, আইন অনুযায়ী মোড়কের নির্ধারিত অংশজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে বহু পণ্যে এর আকার, অবস্থান, রঙ ও মুদ্রণের মান বিধিমালা অনুসরণ করছে না। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নির্ধারিত আকারে মুদ্রিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সতর্কবাণী মোড়কের এমন স্থানে দেওয়া হয়েছে যা সহজে দৃশ্যমান নয়। কিছু পণ্যে ব্যবহৃত ছবি অস্পষ্ট, ঝাপসা বা মানহীন, যা জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর নয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে একই মোড়কে বারবার একই সতর্কচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিধিমালার পরিপন্থী। মূলত তামাকদ্রব্যের দূর্বল মোড়কজাতকরণ, উৎপাদনের তারিখ না থাকা ও তামাক কোম্পানির জবাবদিহিতার অভাবই এই আইন বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। এসব অনিয়ম কমাতে তামাকজাত দ্রব্যের স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাঃ সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার একটি কার্যকর উপায়। গবেষণায় উঠে আসা অনিয়মগুলো দ্রুত সমাধান না হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমরা নতুন অধ্যাদেশটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি।
এডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, বাজারে প্রচলিত তামাকজাত দ্রব্যের মধ্য থেকেই একটিকে স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং জ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন এই স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং এর নিয়মানুযায়ী মোড়ক তৈরি করতে তামাক কোম্পানির কোন সমস্যা না হয়। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং হলে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী যেমন সঠিকভাবে দেওয়া যাবে তেমনি কর আদায়ও সহজ হবে।
আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্যাকেটজাত সকল পণ্যের নিবন্ধন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তামাকজাত দ্রব্য যেহেতু একটি মোড়কজাত পণ্য তাই তামাক কোম্পানিরও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ তামাক কোম্পানির নিবন্ধন নেই। আমরা চেষ্টা করবো তামাক কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে। কোম্পানিগুলো নিবন্ধনের আওতাভুক্ত হলে আইন বাস্তবায়ন সহজ হবে।
হেলাল আহমেদ বলেন, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ তামাকদ্রব্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী আসার পর থেকেই গত ১০ বছর ধরে তামাক কোম্পানিগুলো আইনের লঙ্ঘন করে আসছে। আইনে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মোড়কের উপরের দিকে দেয়ার কথা থাকলেও তা মোড়কের নিচের দিকেই দিয়ে যাচ্ছে।
সভাপতির বক্তব্যে মোঃ বজলুর রহমান বলেন, আইন থাকলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পুরোপুরি বাস্তবায়নের একমাত্র সমাধান হতে পারে স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং। তাই স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজিং প্রবর্তনের মাধ্যমে কঠোর মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলেই তামাক নিয়ন্ত্রণের এই ধারা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
মুক্ত আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন। আলোচকরা সম্প্রতি পাশকৃত অধ্যাদেশটি দ্রুত আইন হিসেবে পাশ করানো, আইনের প্রয়োগ জোরদার, নিয়মিত বাজার মনিটরিং, এবং আইন লঙ্ঘনকারী তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।