স্টাফ রিপোর্টারঃ
ভোটের আগে সবাই গাও হাত লাড়ে ভোট চায়। এটা দিমু সেটা দিমু কয়ে ভোট চায়। কিন্তু ভোটের পর কেউ আর খোঁজ নেয় না। কোনো কাজে গেলে কয়, তুই কে!”আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এভাবেই মনের ক্ষোভ আর আক্ষেপ প্রকাশ করছিলেন নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কবিরাজ হেমম্রম। বর্তমানে তিনি সাপাহার উপজেলার ফুরকুটিডাঙ্গা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও ১১ তারিখ ভোট দিতে এলাকায় যাবেন। তবে তার কণ্ঠে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি এক ধরণের অনাস্থা। বর্তমানে তারা প্রধান দু’টি দলকেই এখন তাদের আস্থার ও ভরসার কেন্দ্র হিসেবে ভাবছেন।
শুধু কবিরাজ হেমরমই নন, নওগাঁ-১ (সাপাহার-পোরশা-নিয়ামতপুর) আসনের আদিবাসী ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষের মনের কথা এখন অনেকটা এমনই। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সাপাহার উপজেলার শাহাবাজপুর, খিদিরপুর, লক্ষীপুর ও ফুরকুটিডাঙ্গা গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে কথা হয় অন্তত ৫০-৬০ জন আদিবাসী ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে। তাদের কথায় উঠে এসেছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক।
শাহাবাজপুর আদিবাসী পাড়ার জগেন কিস্কু, লগেন কিস্কু ও অঞ্জলি মূরমু জানান, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা এলাকার উন্নয়নের গালভরা প্রতিশ্রুতি দিলেও জয়ের পর তাদের এলাকায় দেখা পাওয়া দুষ্কর। তারা বলেন, “ভোটের সময় নেতা-কর্মীরা বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস দেন। কিন্তু ভোটের পর এসব ভাতার কার্ড চাইতে গেলে উল্টো টাকা দাবি করা হয়। টাকা ছাড়া কার্ড মেলে না।” তাদের কথা শাহবাজপুর শাওতাল পল্লীতে এখনও ৩/৪জন বয়স্ক, বিধবা নারী পুরুষ আছে অনেকবার এলাকার জনপ্রতিনিধিদের হাতে তাদের নামের তালিকা দিলেও এখনও তাদের নামে কোন ভাতা প্রদান করা হয়নি। এমনকি তাদের গ্রামে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার কোন রাস্তা নেই বিগত সরকারের আমলে সবাই প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তারা কোন রাস্তা পায়নি। তাদের দাবী আমদের পল্লীতে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার রাস্তা সহ সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সামাজিক উন্নয়নের কথা যে চিন্তা ভাবন করবে আমরা সেই রকম প্রার্থীকেই ভোট প্রদান করব।
ফুরকুটিডাঙ্গা গ্রামের মঙ্গল কিস্কু, গনেশ মুরমু ও সুনিল হেমব্রমসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, এবার তারা হুজুগে নয় বরং বুঝেশুনে ভোট দিতে চান। তাদের দাবি প্রার্থীকে সৎ, যোগ্য এবং ভালো মানুষ হতে হবে। সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে এবং রাস্তাঘাটসহ এলাকার উন্নয়ন করবে এমন ব্যক্তিকেই তারা তাদের মূল্যবান ভোট দেবেন।
তারা জানান, এবার প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। এই জনপদে ৫ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকলেও আদিবাসী সম্প্রদায়ের আলাপ-আলোচনায় উঠে আসছে মূলত দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর নাম। তারা হলেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম। এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভোটাররা।
আদিবাসী পল্লীগুলোতে এখন নির্বাচনী আমেজ বিরাজ করছে। উৎসবমুখর এবং শান্তপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে মুখিয়ে আছেন তারা। তবে তাদের সবার মনেই একটিই প্রত্যাশা নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন তাদের ভুলে না যান এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এই সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমেই তাদের যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নেবেন বলে জানিয়েছেন।