অর্ধশতাধিক মামলার ভার মাথায় নিয়েও মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মুজিব বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ত্যাগের কাছে এগুলো কিছুই না

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬

 

বিকুল চক্রবর্তী: মৌলভীবাজার।।

২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপি এবং তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলেন হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী। গত ১৭ বছর ধরে তাঁর নিজের কাঁধে যেমন ছিল ৭৫টিরও বেশি রাজনৈতিক মামলার ভার, তেমনি একই সময়ে তাঁর দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও ছিল মামলার বোঝা। আর দীর্ঘ ১৭ বছর এই পুরো বুঝাটাই ছিল হাজী মুজিবুর রহমানের কাঁধে।
নেতাকর্মীদের এই দুঃসময়ে হাজী মুজিব একদিনের জন্যও পিছুপা হননি। যতদিন জেলের বাইরে ছিলেন, ততদিন তিনি সকল নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। বিভিন্ন মামলার পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন। যেসব কর্মী জেলে গেছেন এবং তাঁদের পরিবারের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে, তিনি তা নিশ্চিত করেছেন। আর যেসব পরিবারের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল না, তাঁদের পাশে মানসিকভাবে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণেই তিনি নেতাকর্মীদের পছন্দের মানুষ হয়ে উঠেছেন।
এ ব্যাপারে দলের ত্যাগী যুবদল নেতা মহিউদ্দিন আহমদ ঝাড়ু মিয়া বলেন, একজন কর্মীবান্ধব নেতার যে বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরীর মধ্যে তার সবই রয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে কর্মীবান্ধব চরিত্রের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত দেখা যায়।
হাজী মুজিবুর রহমান বলেন, “আমি চার বছরেরও বেশি সময় জেল খেটেছি। এ সময় আমার ভাই অসুস্থ হয়ে মারা যান। আমি তাঁর পাশে থাকতে পারিনি। জেলে থাকা ও ফেরারী জীবনের কারণে আমার ব্যবসায় ধস নেমেছে। ব্যাংক ঋণ কয়েকগুণ বেড়েছে। আমার সন্তান ও পরিবার চরম দুর্দশায় পড়েছে। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেন আমি বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দিই। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বারবার আমাকে সতর্ক করা হয়েছিল, যেন এলাকায় বিএনপির কোনো কর্মসূচি পালন না করি। কিন্তু যখন দেখলাম আমার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জেলে, আমার নেতা তারেক রহমান নির্বাসনে এবং অনেক কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে—তখন আমি আর বসে থাকতে পারিনি। নেতাকর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখতে আমি সভা-সমাবেশ চালিয়ে গেছি। এর ফলে আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। যেখানে বৈঠক করেছি, সেখানেই নতুন মামলা হয়েছে, আর অধিকাংশ মামলায় এক নম্বর আসামি ছিলাম আমি।”
তিনি আরও বলেন, “দুঃখের বিষয়, আমরা যখন সভা করতাম, তখন আমাদের দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি গোপনে তথ্য ফাঁস করতেন। ফলে ছোট-বড় যেকোনো বৈঠকেই পুলিশ হানা দিত। বহুবার ঈদের নামাজ বাড়িতে আদায় করতে পারিনি। একবার ঈদের নামাজ পড়ে সেমাই খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখনই পুলিশ বাড়িতে আসে। সেমাই ফেলে পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল পূর্বাশায় আমার হাজী মুজিব ফাউন্ডেশনে উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে ভাঙচুর করা হয় এবং পরে পুলিশ এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। ব্যবসায়িক ক্ষতি ও ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে শ্রীমঙ্গল পূর্বাশায় আমার শখের বাড়ি—যেখানে একসঙ্গে হাজার মানুষের সমাবেশ করা যেত—সেটিও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।”
তিনি বলেন, “তবে এখন এসব কিছু মনে রাখি না। যখন দেখি আমার নেত্রী কত কষ্ট সহ্য করেছেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন—তখন মনে হয় আমার ত্যাগ তার তুলনায় কিছুই না। সবকিছুর পর আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি যে, আমার নেতা তারেক রহমান আমাকে মূল্যায়ন করেছেন, আমার এলাকার মানুষ আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। সিলেট বিভাগের সর্বাধিক ভোটের ব্যবধানে তাঁরা আমাকে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী করেছেন—এটাই আমার বড় প্রাপ্তি। এখন আমার ব্রত মানুষের পাশে থেকে সেবা করা এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে কাজ করা।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আলম সিদ্দিকী জানান, শ্রীমঙ্গলে তাঁরসহ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে, যার অধিকাংশই হাজী মুজিব নিজে পরিচালনা করেছেন। শুধু মামলা পরিচালনাই নয়, দলের দুঃসময়ে তিনি নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রেখেছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির প্রাক্তন সভাপতি দুরুদ আহমদ বলেন, তিনি শুধু নেতাকর্মীদের কাছেই ত্যাগী নন, এলাকার সাধারণ মানুষের কাছেও প্রিয় ব্যক্তি। গত ১৭ বছর জেল-জুলুমের মাঝেও তিনি মানুষের জন্য কাজ বন্ধ করেননি। দুই উপজেলায় তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। বিশেষ করে তিনি ২০০১ সালে যখন সংসদ নির্বাচনে আসিন হয়ে মানুষকে বিভিন্ন উন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। অল্প ভোটে পরাজিত হলে তিনি সংসদে যেতে পারেন নি। কিন্তু সংসদের না গেলেও মানুষকে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার অনেকাংশই তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে করেদেন।
তার সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে—কমলগঞ্জের কুশালপুরে উম্মেরুন্নেছা দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা, আলেপুরে আব্দুল গফুর মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা,
হাজী মুজিব বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শামীম আহমদ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, জহির উদ্দিন চৌধুরী হাফিজিয়া মা্দ্রাসা প্রতিষ্ঠা, চিশতী ডায়বেডিটক সেন্টার স্থাপন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে গাড়ি প্রদান, দাতব্য চিকিৎসালয়ে গাড়ি প্রদান, পতনউষার উচ্চ বিদ্যালয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, মঙ্গলপুর ও রানীর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাঠ ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, বেঞ্চ-ডেস্ক প্রদান ও শিক্ষার্থীদের আর্থিক অনুদান। এছাড়া কামারছড়া ও রাজঘাটসহ কয়েকটি চা বাগানে নাটমন্দির ও দেবালয় নির্মাণ, ধলাই নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ, মনিপুরি ললিতকলা একাডেমি, প্রেসক্লাব ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে অনুদান প্রদান, কাঁচা রাস্তা ইটসোলিং করা, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারের বিয়ের সহায়তাসহ অসংখ্য জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড সমাজে প্রশংসিত হয়েছে।
এ কারণেই মানুষ তাঁকে বারবার ভোট দিয়েছে। অতীতের নির্বাচনে সরকারদলীয় প্রভাবের কারণে অনেকে ভোট দিতে পারেননি। তবে এবার নিরপেক্ষ নির্বাচনে তিনি ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছেন। আমরা চাই আমাদের দল আমাদের এলাকায় একটি মন্ত্রলালয় ‍উপহার দিবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা বিএনপির প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মো: ইয়াকুব আলি বলেন, আমাদের দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাজী মুজিব সব সময় আমাদের সঙ্গে আছেন এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি স্পষ্টভাবে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, সকল দল-মত, জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে তিনি তার যত কমিটমেন্ট রয়েছে, সেগুলো শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন।
হাজী মুজিবের একটি বিশেষ বার্তাও তুলে ধরেন ইয়াকুব আলি। তিনি বলেন, সরকার থেকে যে পরিমাণ অনুদান পাওয়া যাবে, তাছাড়া নিজস্ব তহবিল থেকেও আরো কাজ করাবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এ এলাকার জনগণের দাবী মৌলভীবাজার-৪ আসনের এই কর্মঠ সংসদ সদস্যকে একটি মন্ত্রনালয় উপহার দেয়ার।
শ্রীমঙ্গল ভাড়াউড়া চা বাগানের বাসিন্দা এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা পরেশ কালিন্দি বলেন, “আমরা চা বাগানের মানুষ তারেক রহমানকে চা শ্রমিকদের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই আসন উপহার দিয়েছি। আমরা আশা করি, তিনি আমাদের একটি মন্ত্রণালয় দেবেন।”
একই আশা ব্যক্ত করেন শ্রীমঙ্গল লাউয়াছড়া পুঞ্জির হেডম্যান ফিলাপত্মী এবং কমলগঞ্জ মাগুরছড়া পুঞ্জির হেডম্যান জিডিসন প্রধান সুচিয়াং। তাঁরা বলেন, হাজী মুজিবুর রহমান একজন সৎ ও শিক্ষিত মানুষ। তাঁর সততা ও মানবিকতার কারণেই এলাকার মানুষ তাঁকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। তাঁদের আশা, তাঁর হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এলে তিনি শুধু এলাকাই নয়, সারাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।