টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় সরকার

শুক্রবার, এপ্রিল ১০, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: কেবল প্রবৃদ্ধি নয় বরং টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন সকালে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি এ তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের কাছে জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা, সে সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন। অন্যদিকে, জনগণও উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমাদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখবেন- এটাও আমরা আশা করি। আমাদের এবারের লক্ষ্য কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।

বাজেটে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সহনীয় রাখতে উন্নয়ন সহযোগীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত বাজেট সাপোর্ট পেতে উদ্যোগ গ্রহণের কথা তিনি বিবৃতিতে তুলে ধরেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে সরকারকে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে নির্ধারিত ভর্তুকির চেয়ে আরও প্রায় ৩৬,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। এটি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করবে, অন্যদিকে সমপরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলবে। সরকার এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, একটি আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে সরকারের অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রদানের প্রয়োজন হলেও জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখে সরকার এখন পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই আমাদের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং আমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত।

তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জনমানুষের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করে এবং অর্থনৈতিক উন্নতির পথে যাত্রা শুরু করে। অতঃপর আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। শিল্পের বিকাশ, বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি ও মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথ পরিক্রমার সূচনা করেছিলেন। ভ্যাট ব্যবস্থার প্রবর্তন, শুল্ক ও আমদানি কাঠামো আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে তিনি অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার ধারণ করে আমরা আজ আবার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি প্রগ্রেসিভ ও টেকসই পথে পরিচালিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা এটি স্বচ্ছতা, সত্যতা ও জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়ন করতে চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভিশনারি চিন্তার মাধ্যমে ইনশাআল্লাহ আমরা এটি সফল করতে পারব।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকার আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব প্রদান করছে। ঘাটতি অর্থায়নের বিকল্প হিসেবে সহজ শর্তের বৈদেশিক উৎস ও অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজার উন্নয়নকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। ঘাটতি অর্থায়ন ও এর উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও ঋণের ঝুঁকি হ্রাসের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত হতে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণ-নির্ভরতা হ্রাস করা হবে। এছাড়া জিডিপি’র উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনা এবং ফিসক্যাল স্পেস তৈরির মাধ্যমে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা হবে। মধ্যমেয়াদি বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক এবং মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নে একটি ডায়নামিক উন্নয়ন করে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবায়ন উপযোগী প্রক্ষেপণ অনুযায়ী সেক্টরাল বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিদ্যমান ছিল।

সরকারের বর্তমান লক্ষ্যগুলো হলো-

১. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজতর হয়।

২. রাজস্ব সংস্কার : করজাল বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও অটোমেশন করা, যাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়।

৩. পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা : এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে।

৪. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ : এসএমই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, যা প্রকৃত জিডিপি বাড়াবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। এটি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।

৫. সামাজিক সুরক্ষা : শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মানব উন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দক্ষ সম্প্রসারণ।

তিনি বলেন, মূলধন গঠনে ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তে পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসি-কে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়া হবে। বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালু করে পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করা হবে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজস্বের স্বাভাবিক চক্রকে সচল করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করবে।