গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

।। ড. মো. এনামুল হক।।

 

সাইবার জগতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো সাইবার আইন যেন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং ন্যায়বিচারের অধিকারকে অযথা সীমিত না করে—এ বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে প্রণীত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে তাই গভীরভাবে আইনগত, সাংবিধানিক ও মানবাধিকারভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। সরকারি আইনভাণ্ডারের তথ্য অনুযায়ী, আইনটি ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রণীত হয় এবং এর মাধ্যমে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ধারা ২০ বিলুপ্ত করা হয়েছে। (Laws of Bangladesh)

আমার অবস্থান হলো—সাইবার অপরাধ দমন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সাইবার নিরাপত্তার নামে এমন কোনো আইন, ধারা বা প্রয়োগ গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়, যার ফলে নাগরিকের বৈধ মতামত প্রকাশ, সরকারের সমালোচনা, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার কার্যক্রম, আইনগত সহায়তা বা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার, নীতির বিরোধিতা করার অধিকার এবং জনস্বার্থের বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাগরিকের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই অধিকারকে সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, হুমকি, সহিংসতায় উসকানি ও অন্যান্য প্রকৃত অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা।

অতএব, সরকারের সমালোচনা এবং প্রকৃত সাইবার অপরাধকে একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সংজ্ঞা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং বিচারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আইন প্রয়োগে অপব্যবহারের ঝুঁকি

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাইবার-সংক্রান্ত আইন ও অধ্যাদেশের প্রয়োগ নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। Amnesty International-ও বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধতামূলক আইন ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে। (Amnesty International⁠)

এই বাস্তবতায় নতুন বা সংশোধিত সাইবার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিক যদি জনস্বার্থে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, কোনো আইনজীবী যদি আইনের শাসন ও বিচারিক স্বাধীনতা নিয়ে বক্তব্য দেন, কোনো মানবাধিকারকর্মী যদি অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন অথবা কোনো নাগরিক যদি সরকারের নীতি নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করেন—শুধুমাত্র সেই মত প্রকাশের কারণে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের সুরক্ষা

আইনের শাসনের রাষ্ট্রে আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে তাদের মক্কেলের পক্ষে কথা বলবেন, সাংবাদিকরা তথ্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করবেন এবং মানবাধিকারকর্মীরা অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কথা বলবেন—এটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

কোনো আইন যেন আইনজীবীর পেশাগত দায়িত্ব পালন, সাংবাদিকের অনুসন্ধানী কাজ কিংবা মানবাধিকারকর্মীর শান্তিপূর্ণ advocacy-কে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ না দেয়। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের আগে অভিযোগের প্রকৃতি, অপরাধের উপাদান, প্রমাণের মান এবং জনস্বার্থের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সাংবিধানিক কাঠামো প্রদান করেছে। সুতরাং সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো আইন ও তার প্রয়োগকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নাগরিকের স্বাধীনতা পরস্পরের বিরোধী ধারণা হওয়া উচিত নয়। বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা—উভয়কেই একই সঙ্গে সুরক্ষা দিতে হয়।

আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনগুলোর ক্ষেত্রে আমি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি—

১. মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা অতিরিক্ত বিস্তৃত বিধান পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

২. অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট, নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে, যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইচ্ছামতো কোনো বৈধ বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে।

৩. সরকার বা রাষ্ট্রের সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার কার্যক্রম এবং শান্তিপূর্ণ নাগরিক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

৪. গ্রেপ্তার, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারিক নজরদারি ও due process নিশ্চিত করতে হবে।

৫. সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, লেখক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের পেশাগত ও মানবাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড যেন অযথা ফৌজদারি মামলার আওতায় না পড়ে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সুরক্ষা প্রয়োজন।

৬. কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে ন্যায্য বিচার, আইনজীবীর সহায়তা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।

৭. সাইবার অপরাধের প্রকৃত ভুক্তভোগী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আইনের অপব্যবহার রোধে স্বাধীন অভিযোগ-পর্যালোচনা ও প্রতিকার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

৮. আইন সংশোধন বা নতুন বিধান প্রণয়নের আগে আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ করা উচিত।

৯. আইনটির প্রতিটি বিধানকে বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

কোনো ব্যক্তি যদি ইতোমধ্যে সাইবার-সংক্রান্ত অভিযোগে আটক, গ্রেপ্তার বা বিচারাধীন থাকেন, তাহলে তার অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণ—এই দুটি বিষয়কে কখনোই এক করে দেখা যাবে না।

বিশেষ করে আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত বা মানবাধিকারমূলক কর্মকাণ্ড এবং প্রকৃত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা জরুরি।

আমাদের প্রত্যাশা

আমরা সাইবার অপরাধমুক্ত, নিরাপদ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ চাই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা এমন কোনো মূল্যে অর্জিত হওয়া উচিত নয়, যাতে নাগরিকের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাইবার নিরাপত্তা প্রয়োজন—কিন্তু তার সঙ্গে মানবাধিকার সুরক্ষাও সমান প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রয়োজন—কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন—কিন্তু আইনের অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অতএব, সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর প্রয়োগ ও ভবিষ্যৎ সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারকে সংবিধান, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

একই সঙ্গে ইতোমধ্যে সাইবার-সংক্রান্ত মামলায় আটক বা বিচারাধীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করার আহ্বান জানাই।

গণতন্ত্রের শক্তি সমালোচনাকে দমন করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতকে আইনসম্মতভাবে সহ্য ও সুরক্ষা দেওয়ার মধ্যেই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত।

লেখক পরিচিত : ড. মো. এনামুল হক
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী