।। ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন।।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গৃহীত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রবর্তন ছিল তেমনই একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান দেশের করব্যবস্থাকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা চালু করেন। শুরুতে এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে, বিশেষ করে কর ফাঁকিতে অভ্যস্ত কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং গণমাধ্যমের একটি অংশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, সময় প্রমাণ করেছে এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, করের পরিধি বিস্তৃত করেছে এবং কর ফাঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর প্রস্তাবিত উত্তরাধিকার কর (Inheritance Tax) নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত নয়, তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং রাজস্ব প্রবাহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়িত হলে প্রথম বছরে প্রায় ১৩ হাজার থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এই করের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি সাধারণ জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না। বরং এটি মূলত উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের ওপর প্রযোজ্য হবে, যার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ হ্রাস পেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান “গরিব আরও গরিব, ধনী আরও ধনী” প্রবণতা কমাতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বহু দেশে উত্তরাধিকার কর দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। এসব দেশে উচ্চ করের পাশাপাশি নাগরিকরা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা করব্যবস্থাকে সামাজিক ন্যায্যতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশেও যদি এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি শুধু রাজস্ব বৃদ্ধিই নয়, বরং সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বড় সম্পদ ও উচ্চমূল্যের সম্পত্তির ওপর ন্যায্য কর আরোপের মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন আরও কার্যকর হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি একটি অগ্রগামী পদক্ষেপ হতে পারে। যেমন ভ্যাট প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একসময় কর সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তেমনি উত্তরাধিকার কর চালুর মাধ্যমে দেশটি আবারও একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
তবে যেকোনো নতুন করব্যবস্থা সফল করতে হলে জনসচেতনতা, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যখন দেখবে যে করের অর্থ উন্নয়নমূলক কাজে সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে—যেমন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান—তখন কর প্রদানে তাদের আস্থা ও আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায্যতার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
লেখক পরিচিত :
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই
চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠক, লেখক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষক
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য