॥ মোঃ গোলাম মোস্তফা কাজল ॥
নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব, _ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে আমার পদচারণার সাক্ষী আছে ঢাকার রাজপথে। কিন্তু দীর্ঘ এই লড়াইয়ের ময়দানে লড়লেও, কখনোই ‘ক্রেডিট’ বা প্রচারণার রাজনীতিতে নিজেকে বিলীন করিনি।
আশির দশকে যখন এদেশ স্বৈরাচার এরশাদের বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিল ছাত্র জনতা, তখন একজন সাধারণ ছাত্রনেতা হিসেবে রাজপথ কাঁপিয়েছি। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন নিশ্চিত করেছি। সে সময়কার একজন ছাত্রনেতা হওয়া সত্ত্বেও নিজের ঢোল নিজে পেটানো বা প্রচারের মোহ আমাকে কক্ষচ্যুত করতে পারেনি।
১/১১-র পট পরিবর্তনের সময় যখন রাজনীতিকে বিরাজনীতিকীকরণের চক্রান্ত চলছিল, তখন ৮০-এর দশকের সাবেক ছাত্র নেতাদের ব্যানারে আমরা প্রথম বিভিন্ন ছোট পরিসরে সভা-সমাবেশ, বিবৃতি, ১/১১ দখলদারদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং তাঁকে জোরপূর্বক বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত রুখতে আমরা ৮০-এর দশকে ছাত্রনেতাদের একটি শক্ত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলি এবং সেই সংগঠনের মাধ্যমে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানোর চক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রুখে দেই। রাজপথের পাশাপাশি আদালতের বারান্দায়ও বহু লড়াই করেছি। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সেই চক্রান্ত নস্যাৎ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। সাথে ছিলেন বিজ্ঞ কয়েক আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রনেতা। আমরা কখনো কখনো পার্টি অফিস পাহারা দিয়েছি। সমন্বয় করেছি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবঃ হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, প্রয়াত বিএনপির সাবেক মহাসচিব খন্দকার দেলোওয়ার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভি আহমেদ, মোঃ শাহজাহান, অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, সেলিম রেজা হাবিব, সামসুজ্জোহা, মেজর অবঃ মিজানুর রহমান, খন্দকার বাবুল চৌধুরি, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু। আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। রাজনীতিবিদদের মধ্যে এম ইলিয়াস আলী, হাবিবুন নবী খান সোহেল, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, শ্যামা ওবায়েদ, হাবিবুর রশিদ হাবিব, রফিকুল আলম মজনু, হারুনুর রশিদ, খন্দকার এনামুল হক এনাম, প্রয়াত ফেনীর সাবেক এমপি জনাব মোশারফ হোসেন। এরা সহ আরও অনেকেই দল চালানোর প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সহযোগিতা করেছেন।
গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুবনেতা হিসেবে আমি ছিলাম সম্মুখ সারিতে। গুম, খুন আর নির্যাতনের পরোয়া না করে রাজপথে সক্রিয় থেকেছি।
সর্বশেষ “জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে” নতুন প্রজন্মের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছি। দেশ ও জাতির মুক্তির নেশায় ফ্যাসিবাদ হটানোর লড়াইয়ে সর্বদা যুক্ত ছিলাম।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজ প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। যারা একসময় স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে মাস্ক ও হেলমেট পরে সাধারণ মানুষের ওপর স্টিম রোলার চালিয়েছিল, তারা আজ খোলস বদলে ‘জেন-জি’ বা আন্দোলনের কৃতিত্ব নিতে মরিয়া। ত্যাগের মহিমা বিসর্জন দিয়ে তারা এখন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতির ভাগ চাইছে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান থেকে চব্বিশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছি।
আমি দল বা রাষ্ট্র থেকে কোনো প্রতিদান চাইনি, আজও চাই না। আমার প্রাপ্তি এটুকুই যে, প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম। কিন্তু যখন দেখি ত্যাগী যোদ্ধাদের উপেক্ষা করে সুযোগ সন্ধানীরা ইতিহাসের ভাগ বসাতে চায়, তখন নীরব থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সত্যের জয় হোক, লড়াই চলুক।