।। শিকদার আবদুস সালাম।।
মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর পবিত্র হজের পর দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ পালিত হয়। অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মানবজীবনে ত্যাগ, আত্মনিবেদন ও আল্লাহভীতির এক অনন্য শিক্ষা বহন করে পবিত্র ঈদুল আজহা।
শামসুল উলামা আল্লামা হযরত শাহসূফী সৈয়্যেদ আহমদ আলী ওরফে জানশরীফ শাহ সুরেশ্বরী রা. তার ঐতিহাসিক নূরেহক গঞ্জেনূর কিতাবে লিখেছেন :
১. হারাম, ২. মিথ্যা, ৩. রেয়া (লোক দেখানো ইবাদত), ৪. হাছাদ (অন্যের প্রতি শত্রুতা), ৫. কেনা (অন্যের গৌরবে অন্তরে ঈর্ষা করা, ৬. আদাওয়াত (হিংসা), ৭. শাহাওয়াত (পর নারীর প্রতি দৃষ্টি), ৮. গীবত (কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষত্রুটি তুলে ধরা), ৯. তকাব্বরী (অহঙ্কার), ১০. তহমত (মিথ্যাচার)।
প্রত্যেক মানুষের জীবন থেকে উল্লেখিত ১০টি বিষয় ত্যাগ করতে না পারলে তার ইবাদত বন্দেগী হবে না। আর যারা ত্যাগ করতে পেরেছে তারা আল্লাহর রাস্তায় কোরবান হয়ে গেছে। আর কোরবানী হলো এই ১০টি বস্তু জীবন থেকে ত্যাগ করা।
নফসের পরিশুদ্ধতা (বা আত্মশুদ্ধি) হলো মানুষের প্রবৃত্তি, অহংকার ও কু-চিন্তা থেকে আত্মাকে মুক্ত করে সৎ, পবিত্র ও আল্লাহর অনুগত হিসেবে গড়ে তোলা। ইসলামিক পরিভাষায় একে ‘তাজকিয়াতুন নফস’ বলা হয়। এর মাধ্যমে মানুষ তার ভেতরের পশুত্ব দমন করে একনিষ্ঠভাবে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়। নফসের তিনটি স্তর উল্লেখ করা হয়েছে- ১.নফসে আম্মারা: যে নফস সবসময় মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচনা দেয়। ২. নফসে লাওয়ামাহ: যে নফস কোনো পাপ কাজের পর নিজেকে ধিক্কার দেয় বা অনুশোচনা করে। ৩. নফসে মুতমাইন্নাহ: যে আত্মা পূর্ণ প্রশান্ত এবং আল্লাহর আদেশের প্রতি অনুগত।
পরিশুদ্ধতার উপায় হলো ১. কোরআন ও হাদিসের নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা। ২. সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি ও ভয় মনে রাখা। ৩. নিয়মিত ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও তওবা করা।
একজন মানুষের দুনিয়াবী জীবনের কীর্তি ও সৌন্দর্য এবং পরকালীন জীবনের স্থায়ী সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে তার নফসের। নফসের শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা, নির্মলতা ও কলুষতা এবং পবিত্রতা ও অপবিত্রতা- প্রতিনিয়তই প্রকাশ পেতে থাকে তার প্রতিটি পদক্ষেপে। জীবনের এ পদক্ষেপগুলোই মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় হয়ত সফলতার উচ্চ শিখরে কিংবা ব্যর্থতার গভীর গিরিখাদে। তাই কুরআন মাজীদ খুব পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে এ নিগূঢ় রহস্য।
অবশ্যই সে সফল হয়েছে, যে নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা বিনষ্ট করেছে। -সূরা শামস (৯১) : ৯-১০
নফসকে পরিশুদ্ধ করার অর্থ হল, সব ধরনের পাপাচার ও কলুষতা থেকে মুক্ত করা। পাপচিন্তা, পাপ-ইচ্ছা ও পাপাচারী মানসিকতা থেকে রক্ষা করা। প্রবৃত্তি ও রিপুশক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মনের সকল চাহিদা ও ইচ্ছাকে আকল ও বিবেকের অনুগামী করা। এরপর আকল ও বিবেককে আল্লাহ তাআলার হুকুম ও বিধানের অনুগত করা।
নফসকে বিনষ্ট করার অর্থ হল, বিভিন্ন প্রকারের গোনাহ ও মন্দকাজে লিপ্ত হয়ে নিজের চিন্তা, কর্ম ও মন-মানসিকতাকে পাপাচ্ছন্ন করে ফেলা। মনের সকল ইচ্ছা ও চাহিদাকে অনুসরণ করে প্রবৃত্তি-রিপুকে শক্তিশালী করা এবং আকল ও বিবেককে রিপুর অনুগামী করা। এভাবে আল্লাহর হুকুম ও বিধান থেকে সরে গিয়ে নিজের কামনা ও বাসনার অনুগত হওয়া।
ঈদুল আজহার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করার যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কার নির্জন মরুভূমিতে এই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। তাঁর অবিচল ঈমান ও আত্মসমর্পণের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি কবুল করেন।
হযরত ইবরাহিম (আ)-কে আল্লাহপাক স্বপ্নযোগে বললেন, তোমার প্রিয়বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি কর। পর পর তিন দিন হযরত ইবরাহিম (আ) এ স্বপ্ন দেখলেন এবং প্রতিদিন ১০০ করে মোট ৩০০ শত উট কোরবানি করলেন। পুনরায় স্বপ্নাদেশ হলো- তোমার প্রিয়বস্তু কোরবানি কর। আল্লাহর পেয়ারা হাবিব বুঝতে পারলেন তাকে কোন বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। কাল বিলম্ব না করে তিনি ইসমাইলকে স্বীয় অভিপ্রায় জানালেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- “সে পুত্র যখন তার সাথে কাজকর্ম করার বয়সে পৌঁছুলো তখন একদিন ইবরাহিম তাকে বললো, ‘হে পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি তোমাকে আমি জবেহ করছি, এখন তুমি বলো তুমি কি মনে কর?” সে বললো, “হে আব্বাজান! আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে তা করে ফেলুন, আপনি আমাকে ইনশাআল্লাহ সবরকারীই পাবেন।” (সূরা আস সফফাত : ১০২) পিতা তার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে নিয়ে কোরবানির স্থান মিনায় উপস্থিত হলেন। নিজের চোখ বেঁধে পুত্রকে উপুড় করে তার ঘাড়ে ছুরি চালালেন পিতা ইবরাহিম (আ)। আল্লাহর হুকুমে ইসমাইলের পরিবর্তে বেহেশতি দুম্বা জবেহ হয়ে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “শেষ পর্যন্ত যখন এরা দু’জন আনুগত্যের শির নত করে দিলো এবং ইবরাহিম পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিলো এবং আমি আওয়াজ দিলাম, হে ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্য করে দেখিয়ে দিয়েছো। আমি সৎকর্মকারীদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা। একটি বড় কোরবানির বিনিময়ে আমি এ শিশুটিকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে চিরকালের জন্য তার প্রশংসা রেখে দিলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহিমের প্রতি।” (সূরা আস সফফাত : ১০৪-১০৯) আত্মত্যাগের এত উঁচু মার্গের অনুপম উপমা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি ঘটেনি।
ঈদুল আজহার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করার যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কার নির্জন মরুভূমিতে এই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। তাঁর অবিচল ঈমান ও আত্মসমর্পণের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি কবুল করেন।
এ ঘটনাই পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য কুরবানির বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে পালিত হচ্ছে।
ঈদের দিন নামাজ আদায় ও পশু কুরবানির মাধ্যমে মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। জানমালের প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আসক্তিকে অতিক্রম করে আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শনই এই উৎসবের মূল বার্তা।
কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির এক মহান অনুশীলন। যাদের ওপর জাকাত ফরজ, তাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব- এটি ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরবানির মাধ্যমে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই নয়, বরং সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার চর্চাও হয়। কুরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং মানবিক বন্ধন আরও গভীর হয়।
আত্মত্যাগের দর্শনে ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে। কুরবানি শুধু পশু জবাই করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব- যেমন লোভ, হিংসা, অহংকার, ক্রোধ ও স্বার্থপরতা এসব কুপ্রবৃত্তিকে দমন করাই এর আসল উদ্দেশ্য।
সত্যিকারের একজন কুরবানিদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালান না, তিনি নিজের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করেন। এই আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়াই কুরবানির মূল শিক্ষা, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণকর।
অযথা বিত্ত প্রদর্শন বা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কুরবানির প্রকৃত চেতনা ধারণ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এতে করে ঈদের আনন্দ সবার মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। ত্যাগ, সংযম ও ভ্রাতৃত্ববোধের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের ঈদুল আজহা। সামাজিকতা ও মাংশ খাওয়ার লোভ সংবরণ করে আমাদের অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা কোরবানী দেই। তাহলেই আল্লাহ কোরবানী কবুল করবেন।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক