বিকুল চক্রবর্তী :
মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানের চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে নেওয়া হয়েছে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
তিন মাসের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ শেষে শতাধিক প্রশিক্ষণার্থী পেয়েছেন প্রশিক্ষণ সনদ। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (NSDA) দক্ষতার সনদও প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থীর চাকরিও নিশ্চিত করা হয়েছে।

ফ্রান্সের দাতা সংস্থা লাইফ-এর অর্থায়নে, সোশ্যাল এইড-এর বাস্তবায়নে এবং বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি (বিজিএস), টাঙ্গাইল-এর কারিগরি সহায়তায় চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের শতাধিক তরুণ-তরুণীকে অটোমোবাইল ও ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে তিন মাসব্যাপী হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রবিবার বিকেলে টাঙ্গাইলের দেওলায় বাংলাদেশ জার্মান সম্প্রীতির কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আয়োজিত সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইল জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (মানবসম্পদ উন্নয়ন) মো. সেলিম মিঞা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক পাইংশৈউ মারমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএস-এর সহকারী পরিচালক জগদীশ চন্দ্র রায়, সোশ্যাল এইডের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার বাবুল আখতার, বিজিএস ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের অধ্যক্ষ সাজেদুল আলম, শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম, ম্যাক বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকর্তা মানস মাদ্রাজি, বিজিএস এর সোশ্যাল মবিলাইজার মো. মাজহারুল ইসলাম, প্রশিক্ষক সৈয়দা আরমিনা আক্তারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সেলিম মিঞা বলেন, “কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের এমন প্রশিক্ষণ শুধু তাদের কর্মসংস্থানের পথই খুলে দেবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সভাপতির বক্তব্যে বিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক পাইংশৈউ মারমা বলেন, “প্রশিক্ষণার্থীদের শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে থেমে থাকিনি, তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সোশ্যাল এইডের নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার বাবুল আখতার বলেন, “চা-শ্রমিক পরিবারের তরুণ-তরুণীদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তারা নিজেদের জীবনমান পরিবর্তনের পাশাপাশি সমাজের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
শুধু প্রশিক্ষণ ও সনদ বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এ উদ্যোগ। প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রশিক্ষণার্থীদের সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতেই সকল প্রশিক্ষণার্থীর চাকরি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সোশ্যাল এইডের মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়ক এস. এ. হামিদ জানান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই ছিল এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, আগামী ১ জুলাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের একটি দল হবিগঞ্জে আরএফএল গ্রুপে এবং অপর একটি দল নরসিংদীর একটি অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেবে।
পরিদর্শনে অংশ নেওয়া শ্রীমঙ্গলের খাইছড়া চা-বাগানের শ্রমিক শিবানী তাতী জানান, তাঁর মেয়ে এই প্রকল্পের আওতায় ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে চাকরি করছেন। ম্যাক বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকর্তা মানস মাদ্রাজি বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে চা-বাগানের বহু বেকার তরুণ-তরুণী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের জন্য এ ধরনের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি দেশের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।