রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল: অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এক সম্ভাবনাময় সমন্বয়

মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

         ।। ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন।। 

 

বাংলাদেশের রাজনীতি যখন নতুন বাস্তবতা, প্রত্যাশা ও দায়িত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন অভিজ্ঞ, পরিশীলিত ও রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির সম্ভাব্য অভিষেক নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব, দুঃসময়ের পরীক্ষিত কাণ্ডারি এবং জাতীয় রাজনীতির সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের উদ্যোগ সেই অর্থে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা কেবল দলীয় নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের নানা বাস্তবতা তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, সংকট, চাপ ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—মতপার্থক্যের মধ্যেও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং দলীয় স্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনায় রাখার চেষ্টা করা।

এই প্রেক্ষাপটে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনা করা হলে বিষয়টি কেবল একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব অর্পণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা, সাংবিধানিক দায়িত্ববোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের একটি সম্ভাবনাময় সমন্বয় হিসেবেও তা বিবেচিত হতে পারে।

বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দল ও সরকার যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পাশাপাশি দক্ষতা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যেমন দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষের সমন্বিত পরামর্শ ও অংশগ্রহণ।

এই ধারাবাহিকতায় বিএনপির সাংগঠনিক ও নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় অভিজ্ঞ রাজনীতিক, পেশাজীবী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ একটি ইতিবাচক সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে। অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, আমান উল্লাহ আমান, ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং ডা. ফরহাদ হালিম ডোনারের মতো অভিজ্ঞ ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পরিসরে সম্পৃক্ততা দলীয় সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করতে পারে। রাজনীতি, প্রশাসন, চিকিৎসা, পেশাজীবী সমাজ ও জনসম্পৃক্ততার বিচিত্র অভিজ্ঞতা একত্রিত হলে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কেবল কোনো একক রাজনৈতিক দল বা নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি নির্ভর করে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার ওপর। রাষ্ট্রপতির পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই এ পদে যিনি অধিষ্ঠিত হবেন, তাঁর কাছে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে একটি নিরপেক্ষ, মর্যাদাপূর্ণ ও সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হতে পারে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্তরাধিকার এবং মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রাম বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো নতুন প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করা, যেখানে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাবে।

আমি বিশ্বাস করি, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের যথাযথ সমন্বয় ঘটাতে পারলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি মর্যাদাপূর্ণ, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের কার্যকর সম্পৃক্ততা দল ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ শান্তি, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় আহ্বান—ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা।

এই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের উদ্যোগকে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের সঙ্গে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা—অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার সমন্বয়ে দল ও রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্য।

মহান আল্লাহ নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, প্রজ্ঞা ও সফলতা দান করুন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জনগণের কল্যাণে তাঁদের দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা, সাহস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে পালনের তৌফিক দান করুন। বাংলাদেশ শান্তি, গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির পথে আরও এগিয়ে যাক—এই প্রত্যাশাই আজ আমাদের সবার।

 

লেখক পরিচিত  : ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই
রাজনৈতিক বিশ্লেষক | মানবাধিকারকর্মী | লেখক | চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল
বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য.