নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ঐতিহাসিক করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত: প্রধান উপদেষ্টা

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে প্রায় ৭০ জন সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে তিনি বিগত আমলের নির্বাচনগুলোকে ‘ফেক’ বা ‘মকারি’ হিসেবে অভিহিত করে এবারের ভোটকে ঐতিহাসিক ও স্বচ্ছ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

গতকাল সোমবার প্রায় ৭০ জন সচিবের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাত্র দুই দিন আগে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান।

প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের অতীত চিত্র তুলে ধরে বলেন, সেগুলো প্রকৃত নির্বাচন ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের মকারি। সব কটিই ছিল ভুয়া নির্বাচন। তিনি সচিবদের আশ্বস্ত করেন, এবারের নির্বাচন হবে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু। নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি, প্রায় লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি। এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনবে।’
প্রধান উপদেষ্টা এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণকে একটি বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অন্তর্ভুক্তি দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষকের আগমনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রেস সচিব জানান, প্রধান উপদেষ্টা বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেগুলোকে ‘প্রহসন’ হিসেবে অভিহিত করেন। ড. ইউনূস বলেন, শেখ হাসিনার আমলের নির্বাচনগুলোর কোনো জনভিত্তি ছিল না এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যবেক্ষকরাও তখন আসেননি। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী প্রচারণায় বড় কোনো উত্তেজনার খবর নেই। রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে গণসংযোগ চালাচ্ছে।

নির্বাচনকে আরো স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের কথাও জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সব কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। ভোটারদের সুবিধার জন্য ‘নির্বাচন’ ও ‘নির্বাচন বন্ধু’ নামের দুটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে। তাঁর আশা, প্রযুক্তির এই ব্যবহার এবারের নির্বাচনকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে।

আসন্ন গণভোট প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে দেশে আর অপশাসন ফিরে আসবে না এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় পরিবর্তন আসবে।

প্রেস সচিব জানান, গত ১৮ মাসে রাষ্ট্র সংস্কারে সচিবদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা। এই সময়ে প্রায় ১৩০টি জনগুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এসব কাজ দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সচিবরা যে আন্তরিকতা ও পেশাদারি দেখিয়েছেন, সে জন্য তিনি তাঁদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টা সচিবদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন।

জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাংলাদেশের জন্য ‘যুগান্তকারী’ : জাপানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তিকে (ইপিএ) বাংলাদেশের জন্য ‘যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত এই ইপিএ বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। প্রধান উপদেষ্টা এই চুক্তিকে যুগান্তকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে।

শফিকুল আলম বলেন, এই ইপিএ চুক্তির মাধ্যমে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় সাত হাজার ৪০০ পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর ফলে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, উৎপাদন ও রপ্তানি আরো সহজ হবে।

‘সম্ভবত আজই শেষ প্রেস কনফারেন্স’ : প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গতকাল বলেন, ‘আজকেরটাই সম্ভবত শেষ ব্রিফিং। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, যদি আমার আচরণে আপনারা কেউ ব্যথিত হয়ে থাকেন, একদম হৃদযন্ত্রের অন্তস্তল থেকে বলছি, আমি আপনাদের কাছে সরি।’

শফিকুল আলম বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দু-একজন উপদেষ্টা ছাড়া অন্য সবাই সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। তাঁদের সম্পদের তথ্য শিগগিরই জানা যাবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৩০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক আসার কথা উল্লেখ করেন উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সর্বোচ্চ ২১১ জনের মতো পর্যবেক্ষক আসছেন।

‘দেশের ফরেন পলিসি বর্গা দেওয়া হয়েছিল’ : প্রেস সচিব বলেন, আগে বাংলাদেশের ফরেন পলিসি এক দেশের প্রভাবাধীন ছিল। এখন সেটিকে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে ভালো রয়েছে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর আসন্ন নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষকদল পাঠাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভারতের গণমাধ্যমের সমালোচনা করে শফিকুল আলম বলেন, গত ১৮ মাসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি, যার একটি বড় কারণ ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ছড়ানো ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য।

সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে এবং চীন বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে, যা সময়সাপেক্ষ।

সংস্কার প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট বাতিল করা একটি বড় সংস্কার। গণমাধ্যম যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করেছে এবং বক্তব্যসংক্রান্ত সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ভোটের আগে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ দেবেন বলে জানান তিনি।