নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও গণপূর্ত খাতের বড় বড় প্রকল্প থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কমিশন বা ‘কাটমানি’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন জোনে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারি কাজ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা হয়ে ঢাকা—চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারদের ওপর প্রভাব বিস্তার, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পেয়েছেন প্রকৌশলী আবুল খায়ের। তৎকালীন সচিব শহীদুল্লাহর বিশেষ সুপারিশে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে তিনি গোয়ালগঞ্জ জোনে প্রভাবশালী পোস্টিং পান বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে। সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শেখ সেলিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে ওই রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ।
চট্টগ্রাম জোনে দায়িত্ব পালনকালে আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে প্রতিটি প্রকল্পে ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ‘পিপিসি টেন্ডার’ বা পার্সেন্টেজ শেয়ারিং টেন্ডার ব্যবস্থাও তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদার কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিল আটকে দেওয়া কিংবা ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হতো। বড় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কুমিল্লায় এমপি তোফায়েল বায়ারের সঙ্গে বিরোধ
চট্টগ্রামের পর কুমিল্লায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েন আবুল খায়ের। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কুমিল্লার তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে একপর্যায়ে তাঁকে কুমিল্লা জোন থেকে আকস্মিকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।
রংপুর জোনে বদলি হওয়ার পরও আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থেমে থাকেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন।
দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি লাইভ সাক্ষাৎকার দেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য অভিযোগ সে সময় প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
ন্যাশনাল হাউজিংয়ে ৫০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির অভিযোগ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কিংবা গণপূর্তের অন্যান্য খাতের পাশাপাশি ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটিতেও আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ঢাকায় ‘মিস্টার ৫%’ এবং বিপুল সম্পদের অভিযোগ।
বর্তমানে ঢাকা জোনে কর্মরত আবুল খায়েরকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—টেন্ডার ও সরকারি প্রকল্পে ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের একটি নিজস্ব বলয় গড়ে তোলা। এ কারণে ঠিকাদারদের একটি অংশের কাছে তিনি ‘মিস্টার ৫%’ নামে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে তাঁর নামে ও স্বজনদের নামে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থাকার দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ন্যাশনাল হাউজিং ও পূর্বাচলে জমি এবং ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে কৃষিজমি ও খামারবাড়ি কেনার অভিযোগও রয়েছে।
দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে শুদ্ধি অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতা জোরদার হলেও অভিযোগের মুখে থাকা এই প্রকৌশলী এখনও প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, আবুল খায়েরের নামে-বেনামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর আর্থিক লেনদেন তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এবিষয়ে বক্তব্যের জন্য প্রকৌশলী আবুল খায়েরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোন রিসিভ করেননি।