মাল্টায় মানবপাচার, শ্রমশোষণ, প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগে ৪১ বছর বয়সি বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নাজমুল ইস্তিয়াককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ভূমধ্যসাগরের ইউরোপীয় দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টার মেলিয়েহায় বসবাসকারী নাজমুল ইস্তিয়াককে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আদালতে হাজির করা হয়। তার বিরুদ্ধে শ্রমশোষণের উদ্দেশ্যে মানবপাচার, অর্থপাচার, প্রতারণা, জবরদস্তি, নথিসংক্রান্ত অপরাধ এবং শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মাল্টার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটির তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ইস্তিয়াক একটি রেস্টুরেন্টে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাংলাদেশ থেকে মাল্টায় নিয়ে যান।
প্রসিকিউশন আদালতে অভিযোগ করে, শ্রমিকদের মাল্টায় চাকরির সুযোগ দেখিয়ে আনা হলেও পরে তাদের শোষণের শিকার হতে হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, চার মাসেরও বেশি সময় কাজ করেও কয়েকজন কোনো বেতন পাননি।
এক ভুক্তভোগী তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তিনি চার মাস ডিশওয়াশার হিসেবে কাজ করলেও এক সেন্টও বেতন পাননি। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, যে রেস্টুরেন্টে তাদের কাজ করার কথা ছিল সেটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকত।
তদন্তকারীদের দাবি, এখন পর্যন্ত পাঁচজন ব্যক্তি ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও শ্রমশোষণের অভিযোগ করেছেন। তবে তদন্তকারীরা মনে করছেন, এর বাইরেও আরও ভুক্তভোগী থাকতে পারেন।
একপর্যায়ে এক শ্রমিক ইস্তিয়াকের সঙ্গে দেখা করলে তাকে তিনটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর একটি নথিতে ওই শ্রমিককে তিন মাস বিনা বেতনে ছুটিতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেওয়া, আস্থা বা কর্তৃত্বের অপব্যবহার এবং জবরদস্তির মাধ্যমে তাদের শোষণ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১১ হাজার ৬৪৬ দশমিক ৮৭ ইউরোর বেশি অর্থ উপার্জনের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া কয়েকজনের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৫ হাজার ইউরোর বেশি অর্থ নেওয়া, জাল নথি তৈরি বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সামগ্রী রাখা এবং ব্যক্তিদের অর্থ, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানানোর অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ তদন্তের পর ইস্তিয়াককে শনাক্ত করে এবং তার রেস্টুরেন্টে অভিযান চালায়। সেখান থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় তিনি বুকে ব্যথা ও উচ্চ রক্তচাপের কথা জানান। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার পর তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালতে আসামিপক্ষ জানায়, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে ওই রেস্টুরেন্টের বিষয়ে জবসপ্লাসের একটি ডিআরআই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছিল। প্রসিকিউশন জানায়, একই বিষয়ে একটি পরিদর্শনও চলছিল।
ইস্তিয়াক নিজেকে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইস্তিয়াকের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। তারা ইলেকট্রনিক ট্যাগের মাধ্যমে নজরদারি এবং সুরক্ষা আদেশের মতো কঠোর শর্ত আরোপের প্রস্তাব দেন।
তবে প্রসিকিউশন জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি, কথিত ভুক্তভোগীরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন এবং তাদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।
প্রসিকিউশন আরও দাবি করে, বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে ইস্তিয়াকের ব্যাপক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে তিনি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।
একজন পরিদর্শক আদালতকে বলেন, কথিত ভুক্তভোগীদের ওপর ইস্তিয়াক যে মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে, এমন ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি।
আসামিপক্ষের দাবি ছিল, জামিন দেওয়া হলে ইস্তিয়াক তার স্ত্রীকে নিয়ে মেলিয়েহায় নিজ বাড়িতে থাকবেন। তবে প্রসিকিউশন জানায়, তাকে রেস্টুরেন্টে ঘুমাতে দেখা গেছে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বা তাদের হুমকি দেওয়ার ঝুঁকি এখনো রয়েছে।
সব পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে ইস্তিয়াককে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে প্রসিকিউশনের আবেদনের পর আদালত ইস্তিয়াকের সম্পদের ওপর ফ্রিজিং অর্ডার জারি করেন। কথিত ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় একটি প্রোটেকশন অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।
মামলাটি পরিচালনা করছেন পরিদর্শক জন স্পিতেরি ও রায়ান মারিও ভেলা। তাদের সহায়তা করছেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আইনজীবী রামন বন স্ল্যাডেন ও শারমেইন আবদিলা। আসামিপক্ষে রয়েছেন আইনজীবী নিকোলাস মিফসুদ ও নিকোল ফালজন। মামলাটির শুনানি পরিচালনা করছেন ম্যাজিস্ট্রেট অ্যাবিগেইল ক্রিতিয়েন।