বিকুল চক্রবর্তী: মৌলভীবাজার:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নিবেদিতপ্রাণ সাধক, কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’-এ ভূষিত হওয়ায় সাহিত্যাঙ্গনে আনন্দ ও গৌরবের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্রসাহিত্য গবেষণা, রবীন্দ্র-চর্চা ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
গত ৭ মে বাংলা একাডেমির প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ ড. আজম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রবীন্দ্রসাহিত্য গবেষণায় অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’-এ ভূষিত হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (১১ মে ২০২৬) বিকাল ৩টায় আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বসবাসকারী অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ বাংলা সাহিত্যের এক নীরব অথচ গভীর মননের সাহিত্যসাধক। পেশায় তিনি একজন অধ্যাপক হলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় সাহিত্যের এক নিবেদিত অনুসন্ধানী হিসেবে। সাহিত্যচর্চায় তাঁর স্বতন্ত্র শব্দবয়ন, বাক্যের নান্দনিক নির্মাণ ও মননশীল বিশ্লেষণ তাঁকে সমকালীন সাহিত্যাঙ্গনে স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি সত্তরের দশকের একজন মেধাবী কবি হিসেবেও পরিচিত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতা ও সাহিত্যচর্চাকে একসূত্রে গেঁথে আজীবন কাজ করে চলেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত নৃপেন্দ্রলাল দাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রম্যাণি-রুচিরা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। এরপর দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, উপন্যাস ও সম্পাদনা মিলিয়ে ১২৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন রয়েছে কাব্যিক আবেগ, তেমনি রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানের গভীর দায়বোধ।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট কবি, গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তা বলেন, “নৃপেনদার রবীন্দ্রবিদ্যা আমাদের চিরকাল ঋণী করে রাখবে। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তাঁর গবেষণা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।” রবীন্দ্র-চর্চাকে আঞ্চলিক ও ঐতিহাসিক পরিসরে নতুনভাবে অনুধাবনের প্রয়াসে তিনি রচনা করেছেন একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ। তাঁর উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রবিষয়ক বইগুলোর মধ্যে রয়েছে— ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ, রস প্রস্থান’, ‘সিলেটে রবীন্দ্র পরিকর’, ‘রবীন্দ্র পত্র : প্রাপক সিলেটিরা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও সিলেট’, ‘হেমন্তবালার রবীন্দ্রনাথ’ (উপন্যাস), ‘রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন প্রবন্ধাবলি : দর্শন ও দিব্যতা’, ‘গীতাঞ্জলি, প্রজ্ঞা ও পূষণ’ এবং ‘রবীন্দ্রনাথ ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণ’। এর মধ্যে ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থটির চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়।
এছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘মৌলভীবাজার-রবীন্দ্রনাথ’ নামে গীতাঞ্জলি প্রকাশনার শতবর্ষপূর্তি স্মারকগ্রন্থ এবং ‘রবিরাগ’ নামে একটি স্মারকগ্রন্থ, যেখানে কুলাউড়া রেলস্টেশনে রবীন্দ্রনাথের রাত্রিযাপনের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।
রবীন্দ্র-গবেষণায় তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সিলেট অঞ্চলের ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র সংগ্রহ। এ বিষয়ে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ জানান, সিলেটের মানুষের কাছে পাঠানো রবীন্দ্রনাথের প্রায় ৩০টি চিঠি তিনি সংগ্রহ করেছেন, যার পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের নিরলস অনুসন্ধান। সাহিত্য-ঐতিহ্যের প্রতি গভীর দায়বোধ থেকেই তিনি এ গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
তিনি জানান, বিশেষভাবে আলোচিত তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধানের একটি ঘটনা হলো সৈয়দ মুজতবা আলীর কাছে পাঠানো রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ চিঠির সন্ধান। জানা যায়, এমসি কলেজে এক ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— “আকাঙ্ক্ষা বড় করতে হবে।” এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখেন। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “আকাঙ্ক্ষা বড় করতে হলে স্বার্থশূন্য হয়ে দেশের কাজ করতে হবে। তবে এত দূর থেকে তো সব কথা বলা যাবে না, শান্তিনিকেতনে চলে আসো।”
এই ঐতিহাসিক চিঠিটির সন্ধানে নৃপেন্দ্রলাল দাশ প্রথমে যোগাযোগ করেন সৈয়দ মুজতবা আলীর বড়ভাই, রাজশাহী বিভাগের সাবেক বিভাগীয় কমিশনার সৈয়দ মুর্তাজা আলীর সঙ্গে। তাঁর পরামর্শে তিনি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বনগাঁও গ্রামে আত্মীয়স্বজনের কাছেও খোঁজ করেন। পরে তাঁর বোনের ছেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সেগুফতা বখত চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোথাও কাঙ্ক্ষিত চিঠির সন্ধান মেলেনি।
তবু থেমে যাননি তিনি। একসময় ভারতের আসামের শিলচরে বরাক সাহিত্য সম্মেলনে গিয়ে নিজের আক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। সেখানে প্রবীণ সাহিত্যপ্রেমী সরুজ দাশ তাঁকে নিয়ে যান শিলচর নরমাল স্কুলের পাঠাগারে। বহু পুরোনো পত্রিকার স্তূপ ঘেঁটে একসময় তিনি খুঁজে পান বিনোদ বিহারী চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বিবর্ত্তন’ পত্রিকায় প্রকাশিত সেই চিঠির অনুলিপি। যদিও সেটি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব হস্তাক্ষরে ছিল না, তবু দীর্ঘ অনুসন্ধানের শেষে এই প্রাপ্তি তাঁর গবেষণাজীবনে এক অনন্য সাফল্য হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্র-ভাবনার প্রসারে তিনি দেশ-বিদেশেও বক্তৃতা দিয়েছেন। ভারতের আসামের গুয়াহাটিস্থ কটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ ও শেষের কবিতা’ বিষয়ে তাঁর বক্তৃতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশের এ অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সম্মান নয়; এটি মফস্বলভিত্তিক সাহিত্যচর্চা ও গবেষণারও এক বড় স্বীকৃতি।
এ ব্যাপারে তরুণ লেখক মৃদুল কান্তি পাল মলয় ও বঙ্গকবি লুৎফুর রহমান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়, গভীর অনুরাগ এবং সাহিত্যঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন— সাহিত্য কেবল সৃষ্টির বিষয় নয়, এটি এক অন্তহীন সাধনা। বাংলা একাডেমির ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’ সেই সাধনারই এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি হয়ে রইল।
অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন, “আমার রবীন্দ্রমগ্নতা আশৈশবের। কোনো প্রাপ্তি বা সম্মানের জন্য এ কাজে আমি জীবন ব্যয় করিনি। বাংলা একাডেমির পুরস্কারকে আমি উপরি পাওনা হিসেবেই বিবেচনা করি। মফস্বলে থেকেও যে আন্তর্জাতিক মানের কাজ করা যায়, সেটার এক অগ্নিপরীক্ষায় আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলাম। বাংলা একাডেমির এই স্বীকৃতি আমাকে আরও বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ববোধ এনে দিয়েছে।”