।। আল আমিন মুক্ত ।।
চলতি অর্থ বছরে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রকল্পে বর্তমান সরকারের ২০০ কোটি টাকার বিশাল বাজেট বরাদ্দ দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী ও বৈপ্লবিক একটি পদক্ষেপ। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের, বিশেষ করে যারা খেলার মাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, তাদের মাঠের সবুজ ঘাসে ফিরিয়ে আনার এবং শিক্ষা ও ক্রীড়ার মধ্যে একটি সুষম সমন্বয় ঘটানোর যে মহতী অভিপ্রায় সরকারের রয়েছে—এই বাজেট তারই শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি।প্রথম আসরে বাচ্চাদের উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, তৃণমূলের মাঠ পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে অংশগ্রহণ নিয়ে এক ধরনের সংশয়, দ্বিধা ও সন্দিহান ভাব লক্ষ্য করা গেছে। আগামী দিনে দ্বিতীয় পর্বের রেজিস্ট্রেশনকে সামনে রেখে এই আয়োজনকে শুধু একটি মৌসুমি উৎসব না বানিয়ে কীভাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী, বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কাঠামোতে রূপান্তর করা যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত ভাবার সময় এখনই।
১. প্রশাসনিক সমন্বয় ও তৃণমূল শিক্ষকদের ডাটাবেজ মডেল
একটি টুর্নামেন্ট তখনই প্রাণবন্ত হয় যখন তার প্রচার ও অংশগ্রহণ রুট লেভেল থেকে সুনিশ্চিত হয়। এ জন্য কেবল উপরিকাঠামো দিয়ে কাজ হবে না; দরকার একটি ত্রিভুজাকার প্রশাসনিক সমন্বয়—জেলা ক্রীড়া অফিসার (DSO), উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার (UEO)।
উপজেলা ভিত্তিক শিক্ষক সেমিনার: রেজিস্ট্রেশন শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি উপজেলার সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকদের নিয়ে একটি সমন্বিত সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। এই শিক্ষকরাই বাচ্চাদের সবচেয়ে ভালো চেনেন এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করার প্রধান কারিগর।
অনুশীলন ও ডিজিটাল ডাটাবেজ: শুধু দল গঠন করে ছেড়ে দিলে চলবে না। শারীরিক শিক্ষা শিক্ষকেরা তাদের দলের বাচ্চাদের প্রতিদিনের বা সাপ্তাহিক অনুশীলনের অগ্রগতি (যেমন- এটেনডেন্স, বেসিক ড্রিল পারফরম্যান্স) একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ বা অ্যাপে ইনপুট দিবেন। এর ফলে কোন উপজেলায় কেমন প্র্যাকটিস হচ্ছে, তা সরাসরি মন্ত্রণালয় বা ক্রীড়া পরিদপ্তর থেকে মনিটর করা সম্ভব হবে।
২. ২০০ কোটি টাকার বাজেট ও কোটি টাকার প্রশ্ন: গবেষণার বরাদ্দ কোথায়?
আমরা অবকাঠামো, জার্সি, মাঠ তৈরি বা ট্রাভেল এলাউন্সের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করি। কিন্তু কোটি টাকার প্রশ্ন হলো—এই ২০০ কোটি টাকার বাজেটে কি বাচ্চাদের ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য কোনো নির্দিষ্ট তহবিল বা উইং রাখা হয়েছে?
একটি শিশু যখন ১২-১৪ বছর বয়সে এই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে, তখন তার ওপর এই প্রোগ্রামের প্রভাব কেমন, তা যদি আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করতে না পারি, তবে দীর্ঘমেয়াদে আমরা অন্ধের মতো পথ চলব। আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে গবেষণা করতে হবে:
সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব: এই নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কমিউনিটি, শিক্ষক ও পরিবারের মানসিকতায় খেলাধুলা নিয়ে কেমন ইতিবাচক বা নেতিবাচক পরিবর্তন আনল? অভিভাবকেরা কি এখন বাচ্চাদের খেলার মাঠে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন?
সাইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট: এই টুর্নামেন্ট বাচ্চাদের মনে স্পোর্টস সম্পর্কে কেমন ধারণা তৈরি করছে? তাদের আত্মবিশ্বাস, টিম-স্পিরিট ও লিডারশিপ কোয়ালিটি কতটুকু বাড়ছে?
ফিজিওলজিক্যাল ডেটা: বাচ্চাদের পারফরম্যান্স, তাদের অ্যানাটমিক্যাল ও শারীরিক গঠন, গ্রোথ এবং অ্যাথলেটিক ডেভেলপমেন্টের গ্রাফটা কেমন?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিরেট বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে বের করে আনা দরকার।
৩. উন্নত বিশ্বের ট্যালেন্ট আইডেন্টিফিকেশন (TID) মডেল বনাম আমাদের বাস্তবতা
বর্তমান যুগ আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের যুগ। জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের দেশগুলো অলিম্পিক বা বৈশ্বিক আসরে মেডেলের বন্যা বইয়ে দেয়, কারণ তারা ১২-১৪ বছর বয়সী বাচ্চাদের শুধু “খেলতে” দেয় না, বরং তাদের ওপর আধুনিক বিজ্ঞান প্রয়োগ করে।
স্পোর্টস বায়োমেকানিক্স (Sports Biomechanics): বাচ্চাদের রানিং টেকনিক, জাম্পিং পজিশন বা থ্রোয়িং অ্যাঙ্গেল ঠিক আছে কি না, তা মোশন অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে দেখা হয়, যাতে ইনজুরি মুক্ত থেকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স পাওয়া যায়।
এক্সারসাইজ ফিজিওলজি ও নিউট্রিশন (Exercise Physiology & Nutrition): বাচ্চাদের কার্ডিওভাসকুলার ফিটনেস, লাং ক্যাপাসিটি, মাসল ফাইবার টাইপ এবং তাদের পুষ্টির চাহিদা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়।
বেসিক ফিটনেস টেস্ট (Field & Lab Tests): ল্যাবরেটরিতে এবং মাঠ পর্যায়ে সায়েন্টিফিক টেস্টের মাধ্যমে একটি বাচ্চার জিনগত বা শারীরিক সুবিধা কোন খেলায় বেশি (যেমন- কার স্প্রিন্ট ভালো, কার স্ট্যামিনা বেশি), তা দেখে তাকে সঠিক ইভেন্টে ডাইভার্ট করা হয়। একেই বলে বিজ্ঞানসম্মত ট্যালেন্ট আইডেন্টিফিকেশন (TID)।
৪. উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নতুন কুঁড়ির মেলবন্ধন: ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন
আমাদের দেশে এখন আর শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান কেবল মাঠের পিটি-প্যারেডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের শীর্ষস্থানীয় ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি উচ্চতর বিজ্ঞান হিসেবে পড়ানো হচ্ছে: ১. যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (JUST) ২. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU) ৩. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (CU) ৪. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (IU) ৫. ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (DIU)এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান’ বিভাগের শিক্ষক, গবেষক এবং ল্যাবরেটরিগুলোকে ‘নতুন কুঁড়ি’র রুট লেভেলের কাজের সাথে সরাসরি যুক্ত করা যেতে পারে।
ল্যাব ভিত্তিক স্ক্রিনিং: প্রতিটি অঞ্চলের নতুন কুঁড়ি থেকে বাছাইকৃত সেরা বাচ্চাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাবে এনে ফিটনেস, ফিজিওলজিক্যাল ও অ্যানাটমিক্যাল টেস্ট করানো যেতে পারে।
সরকারের ল্যাব সেট-আপ ফান্ড: এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অলরেডি কিছু ল্যাব আছে, তবে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ তৈরিতে তা হয়তো পর্যাপ্ত নয়। সরকার এই সুযোগে ২০০ কোটির বাজেট থেকে একটি অংশ দিয়ে এই ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে “অত্যাধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ও পারফরম্যান্স অ্যানালাইসিস ল্যাব” সেট-আপ করে দিতে পারে। এটি দেশের ক্রীড়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দ্বার উন্মোচন করবে। আমাদের গবেষকেরা তখন নিজেদের বাচ্চাদের ওপর নিজস্ব ডেটা ক্রিয়েট করতে পারবেন।
পরিকল্পনাটি যদি সফল করতে হয়, তবে তিনটি স্তম্ভকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট (গবেষণা ও বিজ্ঞান) + তৃণমূলের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক (মাঠের বাস্তবায়ন) + প্রশাসনিক কর্মকর্তা (লজিস্টিক ও সমন্বয়)।এই তিনের সমন্বয়ে যদি নতুন কুঁড়ি প্রোগ্রামটিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে না, বরং গড়ে তুলবে গবেষণালব্ধ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও ডেটা-নির্ভর এক নিখুঁত ক্রীড়া কাঠামো। এই বিজ্ঞানভিত্তিক বীজ যদি আজ কিশোর বয়সে রোপণ করা যায়, তবে আগামী দিনে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম আশার আলো হয়ে জ্বলতে থাকবে।নীতিনির্ধারকেরা এই বিজ্ঞানসম্মত ও দূরদর্শী রোডম্যাপটি বিবেচনায় নিবেন—এটাই আজ ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্সসহ পুরো দেশের ক্রীড়াপ্রেমী মহলের প্রত্যাশা।
আল আমিন মুক্ত
শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর)
শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Email :muktopess@gmail.com
Mobile :01645674807