বিভীষিকাময় জুলাই-আগস্ট, ২০২৪

মঙ্গলবার, জুলাই ৭, ২০২৬

 

।। এডভোকেট মাসুম বিল্লাহ।।

 

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সংকটময়– কালে সরকার সব অফিস আদালত ছুটির দিন? ছুটি ঘোষণা করেন। সাধারণত যে কোন ছুটির দিন আমার রুটিন ওয়ার্ক হচ্ছে সকালে আমার ২ কন্যাকে সময় দিয়ে অন্যান্য কাজ শুরু করা। সেই সুবাদে ৫ই আগস্ট, ২০২৪ সোমবার ছুটির দিন কলিজার টুকরা কন্যাদের বাহির থেকে ঘুরিয়ে আনি। দুপুর ১১ টায় হঠাৎ আকাশে কালো মেঘের ঘটঘটায় হাতে ছাতা নিয়ে আবার বাসা থেকে বের হই মা-বাবার সাথে দেখা করা আর রাজপথের উত্তাল পরিস্থিতি অবলোকনের উদ্দ্যেশ্যে। আমার বাসা মাতুয়াইল, ডেমরা অর্থাৎ নারায়নগঞ্জ সাইবোর্ডর খুব কাছেই। ঢাকা-চিটাগং রোডে উঠে দেখি সাইনবোর্ড মোড়ে কয়েকশ বিজিবি সদস্য পুরো বিশ্বরোড ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছেন। উল্লেখ্য, সেদিন ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ঘোষিত এক দফা আন্দোলন আর রোড মার্চ টু ঢাকা। দেশের এই সংকটময় মূহুর্তে মন অস্থির থাকায় মা-বাবার বাসার সামনে যাওয়া স্বত্বেও সেইদিন ওনাদের সাথে আর দেখা করার ধৈর্য্য হলোনা, তাই দেখাও হলোনা। সর্বোচ্চ ৫/৮ মিনিট মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ার পর আবার ঢাকা-চিটাগং রোডে উঠে দেখি বিজিবির ব্যারিকেড ভেঙ্গে লক্ষাধিক লোক ঢাকায় প্রবেশ করছে। আমি আরেকটু উৎসুক মনে ঘটনার

ভয়াবহতা অর্থাৎ দীর্ঘ দিন ধরে চলে থাকা গণহত্যার দৃশ্য প্রত্যক্ষভাবে দেখার জন্য যাত্রাবাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি রিকসা নিই শনির আখড়া পর্যন্ত। শনির আখড়া গিয়ে প্রচন্ড গোলাগুলি, টিয়াসসেলের শব্দ শুনতে পাই। রিকশা নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল রাজপথের লক্ষ লক্ষ ছাএ জনতার সাথে পায়ে হেটে যেতে সময় লাগবে তাই অগ্রভাগে থাকার জন্য। রিকসা চালক ভাইকে বলি পারলে আরেকটু সামনে যান, যতটুকু পারেন সামনে অগ্রসর হন। তখন রিকসা চালক ভাই কাজলা টোলপ্লাজা পর্যন্ত নিয়ে যায়। রিকসা থেকে নেমে হেঁটে চলে যাই কুতুবখালী উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত এবং একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখার সুযোগ হলো দেশে চলমান গণহত্যার ভয়াবহতার আংশিক/খন্ড চিত্র।

যাত্রাবাড়ির মাছের আড়ৎ থেকে কয়েকশ পুলিশ ভাইরা আমাদের দিকে অস্ত্র পজিশন করে রেখেছেন আর তাদের মধ্যে থেকে পুলিশ ভাইগুলির মধ্যে কয়েকজন ভাই আমাদের দিকে গুলি বর্ষণের পাশাপাশি টিয়ারসেল নিক্ষেপ করছে, সেই পুলিশ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে হেলমেট, লাল-সাদা রংয়ের টি শার্ট আর জিন্স প্যান্ট পরা একজন সুঠামো দেহের অধিকারী মাঝ বয়সী একজন লোক। সেই লোক একাই এতো প্রসস্ত সড়কে যাচ্ছে আর একপাড় থেকে অন্যপাড়ে সুনিপুণভাবে সম্ভবত শর্টগান দিয়ে নির্বিচারে নিরস্ত্র জনতার দিকে গুলি করছে। আর তাকে অনুসরণ করে অন্যান্য পুলিশ ভাইরাও থেমে থেমে গুলি করছে। তখন আমি বাসায় ফেরার কথা ভুলে যাই। কুতুবখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে তার বিপরীতে কুতুবখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে চলে যাই। সশস্র

বাহীনী কর্তৃক নিরস্ত্র ছাএ-জনতার উপর নগ্নভাবে গোলাগোলির ভায়াবহতা যতই দেখি ততই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য মন ব্যকুল হয়ে উঠে। অবচেতন মনে মিশে যাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে, যেই আন্দোলন ছিল শুধুই গণগত্যার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে, ২০২৪ শে পুনরায় স্বাধীনতাকামী আমজনতার জীবনবাজির আন্দোলন। চলছে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা আর সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। কানে ভেসে আসলো জোহরের আযান তার মাঝেই মায়ের ফোন। মায়ের ফোন না ধরার করাণে বারবার ফোন দিচ্ছে। কারণ ফোন ধরলেই আযানের আর গোলাগুলির শব্দে বুঝে ফেলবে আমি ঝামেলায় আছি, তাই আর ফোন ধরিনি। আযান শেষে ভাবছি মসজিদে গিয়ে নামাজ শেষ করে আসি কারণ যেই পরিস্থিতি কত সময় আর কতদিন চলবে তার কোন সম্ভবনা দেখছি না। ভাবতে ভাবতে দেখি একজন ছাত্র কুতুবখালী টোলপ্লাজার কাছে যেতেই বিপরীত পাশ থেকে একটা বুলেট তার মাথায় ভেদ করেছে এবং সাথে সাথে সে লুটিয়ে পড়েছে। তখন ভাবছি এই পরিস্থিতিতে মন দিয়ে নামাজ পড়া হবে না। সেই ছাত্রের নিথর দেহ তার আরেক বন্ধু আনার জন্য দূর থেকে পুলিশ সদস্যদের দিকে হাত উঁচু করে ইশারায় দেখায় তার হাতে কিছুই নেই নিথর দেহ নিয়ে চলে যাবে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি বিশ্বাস আর আস্থা রেখে ছাত্র ভাইটি তার বন্ধুর লাশের কাছাকাছি গেলে তার দিকেও কয়েকটি গুলি ছুঁড়লে তার মধ্যে একটি গুলি তার ঠিক কপালে লাগলে সাথে সাথে ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। ২য় ছাত্র ভাইটিকে গুলি করার পর সশস্ত্র বাহিনী ২/১ মিনিটের জন্য গুলি করা বন্ধ করে। তখন সাহস করে কয়েকজন ছাত্র ভাই সামনে গিয়ে দুজনের লাশ

নিয়ে আসে। এমন ভয়াবহ অবস্থায় আমি ১০/১৫ জন নিয়ে কুতুবখালী দিয়ে যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারে উঠে পড়ি। যখন ফ্লাইওভারের ওপরে এবং যাত্রাবাড়ি থানা বরাবর চলে যাই তখন দেখি পুলিশের একটি সাজোঁয়া যান আমাদের দিকে পজিশন নিয়ে রেখেছে। তখন চিন্তা করি সাঁজোয়া যান আমাদের দিকে আসতে শুরু করলে কোন নিস্তার নাই, দৌড়ে কখনই আমাদের পেছনে ফিরে যাওয়ার সময় টুকো পাবো না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কি অসীম রহমত আমাদের দিকে কতক্ষণ পজিশন নিয়ে উল্টো পথে চলে যায় সাঁজোয়া যানটি, হয়ত তারাই ভেবেছিল ছাত্র-জনতা যদি তাদেরকে আক্রমণ করে তাহলে তাদের রক্ষা নাই। সাঁজোয়া যান নিয়ে পুলিশ বাহিনী পিছু হটার পর শুরু হলো যাত্রাবাড়ি থানার ছাদ থেকে আমাদের দিকে গুলিবর্ষণ, যাতে আমরা যাত্রাবাড়ি ক্রস করে শাহাবাগের দিকে অগ্রসর হতে না পারি। থানার ছাদ থেকে গুলি করা শুরু হলে আমরা সবাই বসে পড়ি। গুলিগুলো ফ্লাইওভারের রিলিং আর ফ্লাইওভারের দেয়ালে লেগে সেখান থেকে খসে পড়া লোহা আর দেয়ালের সিমেন্ট গায়ে এসে পড়ছে। ভাবলাম দৌড় দিব কিন্তু দোঁড় দিলে হাঁটু সোজা করতে হবে আর হাঁটু সোজা করলেই গুলি গায়ে, মাথায় এসে লাগবে। এমন ভয়াবহতায় আমার মা-বাবা আর কলিজার টুকরো ২ কন্যার কথা মনে পড়ল। বিশেষকরে আমার নানুর একটি কথা খুব মনে পড়ল। তখন সবেমাত্র পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করতে শুরু করেছিলাম নানু বলেছিলেন, যখন বিয়ের পর সন্তানের দায়িত্ব চলে আসে তখন মা-বাবার চাইতে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব বা ভালোবাসা বেড়ে যাবে যার কারণে মা-বাবার দিকে ততটা খেয়াল করা যায় না। তাই সময় থাকতে মা-বাবার জন্য কিছু

করো, পরে আর সময় পাবা না। নানুর কথাটি ঠিক মনে পড়তেই আমার কন্যাদের কথা ভেবে দুই চোখে পানি চলে আসলো আর ভাবলাম এখানে আমার লাশ পড়ে থাকলে কেউ কখনই হয়তো জানতে পারবে না আমি কোথায়, কারণ কাউকেই আমি বলে আসি নাই আর লাশের পর লাশ দেখে আন্দোলনে নিজেকে সামিল করব সেই ব্যাপারেও ছিলাম মানসিকভাবে অপ্রস্তুত। তারপর কোন ভাবে বসার পজিশন নিয়ে সবাইকে শাসনের স্বরে ফ্লাইউভার থেকে নেমে যেতে বলি এবং তাদেরকে নিয়ে ধীরে ধীরে আবার কুতুবখালী ফ্লাইওভারের নিচের দিকে চলে আসি। ততক্ষণে যাত্রাবাড়িতে সেনাবাহিনী কিছু সদস্য কয়েকটি সাঁজোয়া যান নিয়ে যাত্রাবাড়ি থানার সামনে চলে আসে এবং পুলিশ বাহিনীকে গোলাগুলি থামাতে বলে তখন পুলিশ ভাইরা গোলাগুলি বন্ধ করে সবাই থানার ভিতরে চলে যায়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদেরকে শান্ত হওয়ার কথা বলে এবং সবাইকে বসতে বলে। তখন কিছু ছাত্র ভাইরা আমাকে বলে এখন কি করব তখন আমি বলি কয়েকজন বসেন আর কয়েকজন সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন আর আস্তে আস্তে সেনাবাহিনীর উপর চাপ বাড়াতে থাকেন। এর মধ্যেই কয়েক লক্ষ লোক যাত্রাবাড়ির অভিমুখে রাওয়ান করেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাঁজোয়া যানের উপর দাড়িয়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পিছু হটে আর আমারদেকে যাত্রাবাড়ি ক্রস করতে দেয়। পুলিশ বাহিনী কর্তৃক নির্মমভাবে ছাত্রহত্যার ঘটনা বিষয়ে সেনা সদস্যদের কাছে অভিযোগ করেই তারা যাত্রাবাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। যাত্রাবাড়ি থানার ভিতরে থেকে পুলিশ সদস্যরা আবার সেনাবাহিনীর সামনেই নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে গুলি করা শুরু করে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাত্র-

জনতাকে নিরপদে রাখতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে, তার পর পুলিশ বাহিনী শান্ত হলে আমরা সবাই শাহাবাগের উদ্দেশ্য রউনা হই। আমরা যখন যাত্রাবাড়ি থেকে শাহাবাগের উদ্দেশ্য রওয়ানা হই। বায়তুল মোকাররম মসজিদে জোহরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে অযু করে মাকে কল ব্যাক করি। তখন মা বলে তুমি ফোন ধর না, আমাকেতো মেরে ফেলবা অর্থাৎ মা আমার জন্য দুঃশ্চিন্তায়া পাগল প্রায়। মা পরে বলে বাসার কাছে প্রচুর গোলাগুলি হচ্ছে, পরক্ষণে মা বলে তুমি কোথায়? আমি বলি মসজিদে আছি নামজ পড়ব। মা ভেবেছে হয়তো আমি বাসার কাছের মসজিদেই আছি।

আরেকটু পেছনে ফিরে দেখা-

আইনঙ্গন:

নির্ধিদায় বলা যায়, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিরিহ মানুষকে একটি পক্ষ যেমন নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে ঠিক তেমনি ঘটনাক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যও নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের স্বীকার হয়েছেন। ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে, নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার লাগাম টানতে মানবাধিকার পক্ষের কতিপয় বিজ্ঞ আইনজীবী মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি পিটিশন দায়ের করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করবে সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু অত্যন্ত লক্ষ্যনীয় বিষয় ছিল রাষ্ট্রপক্ষকে সহযোগীতার নামে তৎকালীন সরকার পক্ষের আইনজীবী কর্মীরা রাজনৈতিক মুভমেন্টের

 

অংশ হিসেবে মাননীয় আদালতে প্রভাবিত করার মতো অপচেষ্টা করেছেন। আওয়ামী সরকার পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীরা ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি করে হত্যার কার্যক্রম আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ঠিক ভাবেই করছেন বলে তারা মাননীয় আদালতে সন্তুষ্ট করতে সামর্থ্য হয়েছেন যারই ফলশ্রুতীতে ছাত্র-জনতার পক্ষে দায়েরকৃত পিটিশন মাননীয় আদালত Summarily Reject করে পরের অনুচ্ছেদে গুলি করার বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। সবার বোধগম্যের জন্য মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের আদেশটি নিম্নে হুবহু তুলে ধরছি-

মাননীয় আদালতের আদেশের বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণঃ

লেখক এডভোকেট মাসুম বিল্লাহ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট !