।। মোঃ গোলাম মোস্তফা কাজল।।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সরকার গঠনের এখনও ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। একটি নবগঠিত সরকারকে কাজ করার জন্য যৌক্তিক সময় দেওয়া উচিত। অল্প সময়ের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ই রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হলো সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা, ভুল-ত্রুটি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তার গঠনমূলক সমালোচনা করা। একই সঙ্গে সরকারের ভালো ও জনকল্যাণমূলক কাজের প্রশংসা করাও বিরোধী দলের দায়িত্ব। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
একটি নির্বাচিত সরকারকে সাধারণত পাঁচ বছরের জন্য জনগণ দায়িত্ব দেয়। এই সময়ের মধ্যে সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে এবং বিরোধী দল গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সরকারকে আরও কার্যকর হতে সহায়তা করবে। পাঁচ বছর শেষে জনগণ সরকারের সফলতা ও ব্যর্থতার মূল্যায়ন করে ভোটের মাধ্যমে আবার সিদ্ধান্ত নেবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
কিন্তু সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই যদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, হুমকি-ধমকি বা সরকার পতনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এতে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এবং দেশের স্বাভাবিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সম্প্রতি সিলেটে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একই সময়ে একই স্থানে দুই পক্ষের সমাবেশ হলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে প্রশাসন যদি ১৪৪ ধারা জারি করে, তবে সেটি তাদের আইনগত দায়িত্বের অংশ। পুলিশের কাজ হলো সংঘর্ষ প্রতিরোধ করা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পুলিশকে অযথা হুমকি দেওয়া, গালিগালাজ করা বা “লাঠিয়াল বাহিনী” বলে আখ্যায়িত করা কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। পুলিশ রাষ্ট্রের একটি পেশাদার বাহিনী। তারা জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হয় এবং তাদের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অতীতে পুলিশের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বর্তমানেও তারা যেন নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে, সে পরিবেশ সৃষ্টি করা সবার দায়িত্ব।
সরকারেরও উচিত ধৈর্য, সহনশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করা এবং উন্নয়ন, সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একইভাবে বিরোধী দলেরও উচিত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা, যাতে অযথা সংঘাত সৃষ্টি না হয়। কারণ সরকার ও বিরোধী দলের সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও সাধারণ মানুষ, আর এর সুযোগ নিতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ।
আমাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যেন সহিংসতা বা সংঘাতের রূপ না নেয়। সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন এবং দেশের সকল রাজনৈতিক শক্তির উচিত পারস্পরিক সহনশীলতা ও সংলাপের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছর দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং জনগণের কল্যাণে একযোগে কাজ করা।
সবাইকে মনে রাখতে হবে, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন মানবিক, সহনশীল, ধৈর্যশীল ও সহজ-সরল মানুষ। এটাকে দুর্বলতা ভাবা ঠিক হবে না। বরং এটাকে সম্পদ হিসেবে কাজে লাগিয়ে সবাই সহযোগিতা করলে সুফল অতি সন্নিকটে।

লেখক:
মোঃ গোলাম মোস্তফা কাজল
(সদস্য: ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন)