সিগারেট কোম্পানিগুলো বেপরোয়াভাবে আইনভঙ্গ করছে

সোমবার, আগস্ট ৩, ২০২৬

জাতির সংবাদ ডটকম।। 

সারা দেশের বিক্রয়স্থলে সিগারেট কোম্পানিগুলো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সুপরিকল্পিতভাবে ভঙ্গ করছে আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ২টি বিদেশী কোম্পানি। এছাড়াও আইন বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাও উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ফলে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের হার ২০২৫ এর তুলনায় চলতি বছরে কমে এসেছে। খুলনাতে কমেছে ১৯%, রংপুরে কমেছে ১৮%, রাজশাহীতে কমেছে ১১%, ঢাকা ও সিলেটে কমেছে ১০% ও চট্টগ্রামে কমেছে ৫%।

টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আজ সোমবার (০৩ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত “বাংলাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা” শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। অধিকাংশ পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে আইন অনুযায়ী ধূমপান নিষিদ্ধ সংক্রান্ত সাইনেজের অভাব, প্রকাশ্যে ধূমপানের প্রবণতা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড প্রচারণা ও দৃশ্যমান প্রদর্শনের ব্যাপক উপস্থিতি এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির ঘটনা আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। বক্তারা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী ও প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হেলাল আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ মোমেনা মনি, অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ আখতারউজ-জামান, মহাপরিচালক, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এছাড়াও অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের এনফোর্সমেন্ট এন্ড মনিটরিং কনসালটেন্ট হোসেন আলী খোন্দকার, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মীর আলমগীর হোসেন, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অধিশাখা) মোঃ মামুনুর রশীদ, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো-ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এর লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এর প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর জয়েন্ট সেক্রেটারি মোবারক হোসেন, ঢাকা ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: সরকার ফারহানা কবীর, আইনজীবী ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সেতু’র প্রকল্প পরিচালক শাগুফতা সুলতানা, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের দপ্তর সম্পাদক সৈয়দা অনন্যা রহমানসহ অন্যান্য বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ।

টোব্যাকো কন্ট্রোল এন্ড রিসার্চ সেল (টিসিআরসি), ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সদস্য সচিব ও প্রকল্প পরিচালক, সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিসিআরসি’র প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজা।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ফারহানা জামান লিজা বলেন, মাত্র ২১ শতাংশ পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত ছিল। যেখানে সাইনেজ ছিল, তারও মাত্র ৫২ শতাংশ আইন অনুযায়ী স্থাপন করা হয়েছিল। পর্যবেক্ষণকৃত ৩৬ শতাংশ স্থানে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা গেছে এবং ৪৮ শতাংশ স্থানে সিগারেট বা বিড়ির ফিল্টার ও অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে, যা ধূমপানের উপস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া ১৬ শতাংশ পাবলিক প্লেস ও পরিবহনের ভেতরে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়কেন্দ্র পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তামাক বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রদর্শন-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। গবেষণাটি দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে পরিচালিত হয়। এতে মোট ৭০০টি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহন এবং ৮১৯টি তামাক বিক্রয়কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন বিদ্যমান। এর মধ্যে ৯১ শতাংশে ব্র্যান্ড প্রচারণা, ৬৮ শতাংশে ব্র্যান্ডিং সামগ্রী ব্যবহার, ৯০ শতাংশে দৃশ্যমানভাবে তামাকজাত দ্রব্য প্রদর্শন, ৭১ শতাংশে নতুন ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রচারণা, ৬৭ শতাংশে মূল্যভিত্তিক প্রচারণা এবং ৭৬ শতাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে তামাক কোম্পানির ব্র্যান্ডযুক্ত সাইনবোর্ড দেখা গেছে। গবেষণার ফলাফল নির্দেশ করে যে, বিক্রয়কেন্দ্রগুলো এখনও তামাক কোম্পানিগুলোর অন্যতম প্রধান বিপণন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির কাছে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করা হয়েছে এবং ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের দিয়েই তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করানো হয়েছে। গবেষণাটি এ ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়ন, বিক্রেতাদের সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছে।
গবেষণায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে আইন অনুযায়ী ধূমপান নিষিদ্ধ সাইনেজ নিশ্চিত করা, নিয়মিত মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করা, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকজাত দ্রব্যের দৃশ্যমান প্রদর্শন, ব্র্যান্ডিং ও পরোক্ষ বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের জন্য আইনের সাথে সম্পৃক্ত সকল মন্ত্রনালয়ের ভূমিকা নিয়ে একটি কার্যকর মিটিংয়ের আয়োজন করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়। এছাড়াও ১ মাসের মধ্যে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন। স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি বন্ধ করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দেন।