বিকুল চক্রবর্তী: মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান প্রতিরোধে গত আট মাসে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সরাইল রিজিয়ন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরাইল রিজিয়নের আওতাধীন ১৩টি ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন অভিযানে ৯১৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫০ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য, চোরাচালানি পণ্য ও অন্যান্য অবৈধ মালামাল জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন ঘটনায় আটক করা হয়েছে ২৮১ জনকে।

সম্প্রতি (গত বৃহস্পতিবার) মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা বিওপিতে ৫২ বিজিবির উদ্যোগে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান, বিয়ানীবাজার ব্যাটালিয়ন (৫২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান সুজন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান সুজন বলেন, সরাইল রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ প্রায় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার সীমান্ত। এর মধ্যে সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও শ্রীমঙ্গল—এই চারটি সেক্টরের অধীন ১৩টি ব্যাটালিয়নের ২১১টি বিওপি সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র ও সীমান্তপথে অবৈধ পণ্য প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে।
গত আট মাসে সরাইল রিজিয়নের ১৩টি ব্যাটালিয়নের অভিযানে ১১টি পিস্তল, সাতটি ম্যাগাজিন, সাতটি এয়ারগান, পাঁচটি পাইপগান ও ৪০ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ১৯ কেজি উচ্চ বিস্ফোরক, ১১৭টি ডেটোনেটর এবং ৩০ মিটার ডেটোনেটর তার জব্দ করা হয়।
মাদকবিরোধী অভিযানে বিজিবি সদস্যরা ৩ লাখ ৭ হাজার ৭৮৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১৩ হাজার ১৬৮ কেজি গাঁজা, ৫৮ হাজার ৭০০ বোতল বিদেশি মদ ও বিয়ার এবং ১৪ হাজার ৩০০ বোতল ফেনসিডিল ও ইস্কাফ সিরাপ জব্দ করেছেন। এছাড়া ৩ লাখ ৪ হাজার ৮০০ পিস বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট ও ১৫১ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় ২৮১ জনকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায়ও অভিযান চালাচ্ছে বিজিবি। সরাইল রিজিয়নের ময়মনসিংহ ও সিলেট সেক্টরের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে পরিচালিত অভিযানে ১৫ হাজার ঘনফুট পাথর ও ৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান সুজন আরো বলেন, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরাইল রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ বিশাল সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি সদস্যদের কঠোর পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও সমন্বিত অভিযানের কারণেই গত আট মাসে বিপুল পরিমাণ মাদক, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।
অধিনায়ক আরও বলেন, চোরাচালানকারীরা সীমান্তের দুর্গম এলাকা ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ পণ্য পারাপারের চেষ্টা করে। তাদের এসব তৎপরতা প্রতিহত করতে বিজিবির টহল ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সন্দেহজনক চলাচল ও চোরাচালানের তথ্য পেলে স্থানীয় জনগণকে বিজিবিকে জানানোর আহ্বানও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সীমান্তকে নিরাপদ রাখা শুধু বিজিবির একার দায়িত্ব নয়; সীমান্তবর্তী মানুষের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।