রংপুরকে নিয়ে এত চক্রান্ত কেন?

শনিবার, আগস্ট ২৯, ২০২৬

 

।। মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কাজল।।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর আবু-সাঈদ-হত্যার মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন ও আরও একটি মুক্তির যুদ্ধের সূচনা হয়ছিলো। যখন সবাই ব্যর্থ, আর কোন আসার আলো নাই তখন মনে হল আবু-সাঈদ হত্যার মধ্যে দিয়ে মুক্ত হল দেশবাসী। সারা দেশ আগুন-আগ্নিগর্ভ হয়ে এবং দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল বিক্ষোভ।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড কেন সেদিন একটি জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছিল(?) ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আন্দোলন যখন নানা বাধা ও ব্যর্থতায় থমকে যাওয়ার উপক্রম, তখন আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে। তাঁর মৃত্যুর পর বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে। সেদিনই মনে হয়েছিল—স্বৈরাচারী শাসনের পতন এখন সময়ের ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্য হয়েছিল।
আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে রংপুর এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা থেকে আন্দোলনের বিস্তার ঘটলেও এর অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছিল রংপুর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—রংপুরকে ঘিরে এত আলোচনা, এত উত্তেজনা ও এত ধরনের ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন কেন?
কখনো শোনা যায় রংপুরকে পৃথক প্রদেশ করার কথা, কখনো রংপুর দখল বা জাতীয় পতাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নানা উসকানিমূলক বক্তব্য সামনে আসে। কোথাও আবার ইতিহাস, ধর্মীয় অনুভূতি ও সাম্প্রদায়িক আবেগকে উসকে দেওয়ার মতো নানা কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি।
এরই মধ্যে রংপুরে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নানা ধরনের বক্তব্য, অভিযোগ ও জঙ্গিবাদের তত্ত্ব সামনে আসছে। কিন্তু কোনো তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা মতাদর্শকে দায়ী করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।
আমরা কোনো তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে আগাম সিদ্ধান্ত দিতে চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে নীরবও থাকা যায় না। কারণ চারটি নিরীহ প্রাণের মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় নয়। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করা এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্ত, প্রভাবিত বা বাধাগ্রস্ত করা না হয়। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে কিংবা অন্য কাউকে দায়ী করে মূল ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
দুঃখজনকভাবে, ইতোমধ্যে একটি শ্রেণির তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন মহল এসব ঘটনার মধ্যে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ কিংবা অতীতের ‘বাংলা ভাই’-এর প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু কোনো নতুন ঘটনার সঙ্গে পুরোনো কোনো ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকতে হবে।
আজকের পৃথিবী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজে সহিংসতা, উগ্রবাদ কিংবা জঙ্গিবাদের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। অতীতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, সেখান থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।
তাই রংপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের উগ্রবাদী বা জঙ্গিবাদী তৎপরতা যদি সত্যিই থেকে থাকে, তবে অবশ্যই তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে যদি এসব ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, পরিকল্পিত অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত থাকে, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে।
দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো অপচেষ্টা আমরা দেখতে চাই না। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬, ২০০১ থেকে ২০০৫ এবং ১/১১-এর মতো বিভিন্ন সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নানা ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ইতিহাসের এসব অভিজ্ঞতা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। তবে অতীতের উদাহরণকে বর্তমানের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জুড়ে না দিয়ে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ, ব্যবসায়ী ও সর্বস্তরের জনগণের দায়িত্ব হলো—দেশের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা। অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দেশ, আমাদের সমাজ এবং আমাদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সুরক্ষা আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে রংপুরের বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। রংপুরকে ঘিরে কোনো ষড়যন্ত্র বা অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা যদি থেকে থাকে, তা শুধু রংপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই কোনো ধরনের উসকানি বা ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। সরকারকে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।
একটি হত্যাকাণ্ডেরও যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে—এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সাম্প্রদায়িক বা জঙ্গিবাদী তকমা দিয়ে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে। কঠোরতা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের শাসন, নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। আমাদের সোনার বাংলাদেশকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দেশি-বিদেশি কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে আর কলঙ্কিত হতে দেওয়া যায় না। রংপুরের মানুষ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, ন্যায়বিচার চায়। আর সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের—সবার আগে রাষ্ট্রের।

লেখক:
মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কাজল
সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন