শাস্তির বদলে পদোন্নতি পেয়ে বেপরোয়া ‎গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারওয়ার জাহান

সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২৬

জাতির সংবাদ ডটকম।।

‎স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থা চালু করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এ প্রক্রিয়ায় কয়েক দফা বদলি কার্যক্রম চালিয়ে বাহবা কুড়িযেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে দিন গড়াবার সাথে সাথে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সরাসরি লটারি ও প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা জালিয়াতির অভিযোগ ওঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী কারসাজিতে জড়িত প্রভাবশালী একটি চক্র।

‎যাদের ম্যানেজ করে ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিবাজরা কৌশলে প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নিচ্ছেন।

‎সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ আর অনুসন্ধানে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে যাদের নাম চাউর রয়েছে তাদের অন্যতম হচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান। যাকে লটারি বাণিজ্যের উদ্ভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালের শেষ দিকে সারওয়ার জাহান সংস্থাপনের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ জোরালো হয়। এসব বদলির ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে একই স্টেশনে দুই বছরের কম সময় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বদলি করা হয়েছে, যা সাধারণত নিয়মবিরুদ্ধ। লোভ-নীয় পোস্টিংয়ের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া, নিয়মবহির্ভূত বদলি অনুমোদন এবং কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন একই স্টেশনে থাকা কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে নানা খবর প্রচার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেয়ার পরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আড়াল করতেই ‘লটারি পদ্ধতির’ নামে দুর্নীতির কৌশল বেছে নেয়া হয়। এই নিয়মের ফাঁকফোকর বের করে সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের পছন্দের প্রকৌশলীদের সঙ্গে প্রথমে যোগাযোগ করে একটি তালিকা তৈরি করে। সেই তালিকায় যাদের নাম দেওয়া হয়, তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা দাবি করা হয়। যারা টাকা দিতে রাজি হন, তাদের নাম নিজ প্রশাসনিক বিভাগ যাই হোক না কেন, ঢাকা জেলার লটারির বাজে নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা জেলার লটারি বাঙে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসি-ংহ ও খুলনা বিভাগের কর্মকর্তাদের নাম পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব কর্মকর্তার নাম কীভাবে ঢাকা জেলার বাজে এলো অথবা কোন প্রক্রিয়ায় তাদের নাম সেখানে আনা হলো, তার সঠিক কোনো ক্রাইটেরিয়া নেই বলে অভিযোগ।

‎সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট এ প্রক্রিয়ায় ৪০৯জন প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এসব বদলি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত চালালে দুর্নীতির ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

‎তাদের ভাষ্য, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানকে ঘিরে অভিযোগ এটি নতুন নয়। চাকুরি জীবনে তিনি এরচেয়ে গুরুতর অপকর্ম করে ধরা পড়েও শাস্তির বদলে পদোন্নতি পেয়েছেন। অভিযোগটি হচ্ছে, ঠিকাদারের ১০ লাখ টাকার জামানতের পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়ন করেন। নথিপত্র অনুযায়ী, মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের অধীন কাশিমপুর কারাগার-২ এর এইচটি ক্যাবল ফল্ট লোকেটর মেশিন সরবরাহের অনুকূলে ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার ঠিকাদারের কাছ থেকে জামানত হিসেবে নেন। পে অর্ডার ক্যাশ করার কারণে চট্টগ্রামের ইউনিভার্সেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সত্ত্বাধিকারী মো. আবুল হাশেম অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তদন্ত করে কাশিমপুর কারাগার-২ এর এইচটি ক্যাবল ফল্ট লোকেটর মেশিন সরবরাহের অনুকূলে জামানত বাবদ ঠিকাদারদের জমা করা ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডারটি অবৈধভাবে ক্যাশ করার সত্যতা রয়েছে বলে মতামত দেয়। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচারণের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে যান সারওয়ার জাহান।

‎নথি দৃষ্টে দেখা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামের সই করা অফিস আদেশে বলা হয়, সারওয়ার জাহান গত ১৭ মার্চ লিখিত জবাব দেন এবং ২২ মে তার ব্যক্তিগত শুনানি নেওয়া হয়। উভয়পক্ষের শুনানি এবং বিভাগীয় মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তার চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ বিবেচনায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সর্তকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন বলে অঙ্গীকার করেন।

‎সারওয়ার জাহানকে ভবিষ্যতে সতর্কতার সঙ্গে বিধি-বিধানের আলোকে কাজ করার নির্দেশনাসহ বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো বলে অফিস আদেশে জানানো হয়।

‎এদিকে ঘটনাটি ফাঁস হওয়ায় ফেঁসে গেছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সত্বাধিকারী মো. আবুল হাশেম। তিনি ৭-৮ বছর আগে কাজ সম্পন্ন করার পরও জামানতের টাকা এখনো ফেরত পাননি। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরির পর অসুস্থ হয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

‎এ বিষয়ে মুহাম্মদ সারওয়ার জাহানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া মেলেনি।সূত্র- দৈনিক আমার কাগজ