সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেলের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

 

 

জাতির সংবাদ ডটকম।।

সাব রেজিস্টার বদলি করে শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে যখন মাইকেল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তোরজোড় চলছে দুদকে, তখন সেই চক্রের মূলহোতা অভিযুক্ত খিলগাঁওয়ের সাব রেজিস্টার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। তিনি অর্জন করেছেন প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার আফতাব নগরেই রয়েছে মাইকেলের বিলাস বহুল ভবনে ২৯ টি ফ্ল্যাট। গুলশান-১ এর ৭ নং রোডের ৭ নং কোহিনুর টাওয়ারে তার বর্তমান আবাস্থল । এখানে ২ টি ফ্লোর নিয়ে ডুপ্লেক্স করে রাজকীয় জীবন তার।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ব্লক এ ২৭ নম্বর বাড়ি। গুলশান সার্কেল ১ প্লট ৩৭,৩৯,৪১  এবং ব্লক ই এর ৬ নম্বর রোডের ৩০১/এ ১০ কাঠার পুরো প্লটটি স্ত্রীর বড় ভাইয়ের নামে কেনা। গুলশান ১ এর ৭ নম্বর রোডের ৩ নম্বর শখিনা নামের বিলাশবহুল বাড়িটির তৃতীয় চতুর্থ তলায় ২৫০০ স্কয়ার ফিটের দুটি বিলাশবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে যার প্রতিটি ফ্ল্যাটের মুল্য কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা।

গুলশান-১ এর ৪ নম্বর সড়কের ৪বি, গুলশান-১ এর স্টার সেন্টারে বাণিজ্যক স্পেস, পূর্বাচল মডেল টাউনের মা মহল,  সেক্টর ১১৩ এর, রোড ১০৬, প্লটি তার শ্যালকের নামে। গুলশান-১ এর ৩৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর হাউজে রয়েছে ১০ কোটি টাকা মূল্যের ২০০০ বর্গফুট এর ২টি ফ্ল্যাট।

৪০/২ নর্থ এভিনিউ গুলশানে তার ৩টি ফ্ল্যাটের নির্মাণ কাজ চলমান। গ্রিন ভিউ এপার্টমেন্ট, এইচ#৩৯, রোড-২৪ লেক সার্কেল গুলশান-১ এ ২৫০০ বর্গ ফুটের একটি ফ্ল্যাট যার মূল্য প্রায় ১২ কোটিরও বেশি। তার স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে রয়েছে প্লট ১৪৩, ব্লক এইচ এর পুরো প্লট যার নাম্বার ৬। নিকেতন এ/১৩৩, ব্লক এ, রোড-৩ ১৮০০ স্কয়ার ফিটের ১ টি ফ্ল্যাট , হাতিরঝিল এর কাছে ৪৮/এ তে রয়েছে ১৫৫০ স্কয়ার ফিট এর ফ্ল্যাট যা তার শ্যালকের নামে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাদেকপুর গ্রামে ইটের ভাটা, রুপগঞ্জ নারায়নগঞ্জের ইসাপুর বাজার আবাসিক প্রকল্পের জলসিড়ি আবাসন প্রকল্পে রয়েছে ব্লক ডিতে ৫ কাঠার দুটি, ব্লক এতে ১০ কাঠার একটি যা তার বোনের নামে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। বড় মগবাজারের ৭০৪/১ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট, পান্থপথের কাঠাল বাগানের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ২৪/সিতে রয়েছে ২টি ফ্লোর প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে তিনটি করে ইউনিট, যেখানে একটি ফ্লোর রেখেছেন নিজের চিত্তবিনোদনের জন্য। বনশ্রীর জে ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ১০ নম্বর বাড়ির বি ইউনিটে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন ভাতিজার নামে। বনশ্রীর ব্লক বি এর হোসাইন মঞ্জিলের ৫ম তলায় বোনের স্বামীর নামে কেনা দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা যায়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার খাদিজা ভিলা নামের আবাসিক ভবনেও রয়েছে তার একটি ফ্ল্যাট নিশ্চিত হওয়া গেছে।  মোহাম্মদপুর ব্লক ডিতে আজম রোডের  ৮৮ নম্বর বাড়িতে ১৭০০ স্কয়ার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল সদরের পশ্চিম আকোরটাকুর পাড়ার ব্লক এ তে ১৫ নম্বর প্লটে জায়গা কিনেছেন।

নিজ জেলার খাস নগর (পূর্ব পাড়া ) বাঞ্ছারামপুরে কৃষি জমি ১০০বিঘা। লাহিড়ী, রসুল্লাবাদও নবীনগরে রয়েছে ৩০ বিঘা কৃষি জমি, মাছের ঘের ও খামার।তার নিজ গ্রাম খাল্লাসহ বাড্ডা সলিমগঞ্জ, মাঝিয়ারার জীবন নগরে ২০ একর কৃষি জমিসহ মাছের ঘের ও খামার রয়েছে।

এছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে বেনামে ধানমণ্ডি , গুলশান, নিকুঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার কোটি কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট ও প্লট।

আফতাব নগরে নিজের আলাদা বলয় থাকার কারণে বের করা যাচ্ছে না নির্দিষ্ট আরও ফ্ল্যাট এর হোল্ডিং নম্বর।

তবে মাইকেলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন জানান, এক আফতাব নগরেই তার রয়েছে ২৯টি ফ্ল্যাট, বেশিরভাগ ফ্ল্যাটর মূল্য প্রতি ৫ কোটি টাকার কাছাকাছি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আমলে নন ক্যাডার থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্টার পদে নিয়োগ পাওয়া আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ দলকে ব্যবহার করে ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অর্থের মালিক হন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সাব-রেজিস্টার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন করে বেশ সমালোচনায় আসেন দেশজুড়ে।

এরপর বর্তমানে বিএনপির নেতাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে ব্যাপক চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তিনি ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বরে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবার নিয়োগ দেয়া ২৮তম বিসিএসের নন ক্যাডার থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ পান । তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবে প্রথমবার দলীয় লোকদের নন ক্যাডারে সাব রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ বাগিয়ে নেন তিনি।শুধু নিজের নয়, চাকরির শর্ত পূরণ না করেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই বিসিএস ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পান ৯৫ জন।

যার মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন মাইকেলের আপন বোন আসমাউল হুসনা লিজা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে চিহ্নিত হওয়ার পরও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দপ্তরে বহাল রয়েছেন তিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাঞ্ছারামপুরের খাল্লা গ্রামে তার বাড়ি। ঐ এলাকার এমপি ও তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম তাজের সঙ্গে পারিবারিক সখ্যতা থেকে বাগিয়ে নেন দুই ভাই বোনের চাকরি। শুধু চাকরি নয়, চাকরিতে যোগদানের পরে দুজনেই দেশের লোভনীয় পোষ্টিংও বাগিয়ে নেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে হাত মিলিয়ে বদলি বাণিজ্যে সফলতা পেয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন হয়ে যান সাব-রেজিস্ট্রার জগতের গডফাদার। বিভিন্ন সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর সাথে শুরু করেন সাব-রেজিস্টারের বদলী বাণিজ্য। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুল হকের বাড়িও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হওয়ায় সহজেই গড়ে তোলেন বদলী বাণিজ্যের সাম্রাজ্য ।

এতে করে নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে টাকার বিনিময়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে গড়ে তুলেন সখ্যতা । সর্বক্ষেত্রে তার অবৈধ অর্থ উপার্জনের শেল্টার দাতা ছিলেন আনিসুল হক।

তিনি স্বেচ্ছায় আওয়ামী ধরনের সাব-রেজিস্টার হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

নিজের অবস্থান ঠিক রাখতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উচ্চ পর্যায়ের এক দুই জন সাংবাদিকদের সঙ্গে করেন সখ্যতা। এতে সরকারের কোন পর্যায়ের লোকজন তার দিকে আঙ্গুল তুললেই সাংবাদিকদের মাধ্যমে হয়রানি শুরু করেন।

সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখেন বিভিন্ন সাব-রেজিস্টারদের।

অবৈধ সম্পদের বিষয়ে জানতে মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উল্লেখ, এর আগে গত ১৩ এপ্রিল দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর প্রধান কার্যালয়ে রমজান- মাইকেল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে অভিযোগ দিয়েছে রাফসান আল আলভী নামের সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। এরপর থেকে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেখানে তিনি সাব- রেজিস্ট্রার বদলিতে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদক চেয়ারম্যানের নিকট অনুরোধ জানান।