“নিঝুমদ্বীপে দুইদিন এক রাত: হরিণ, নীরবতা আর কিছু মানুষের অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প”

শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

 

গাজী আক্তার
নিঝুমদ্বীপ, হাতিয়া, নোয়াখালী থেকে ফিরে

 

কিছু জায়গা আছে, যেখানে গেলে মনে হয় পৃথিবীটা এখনও শান্ত, নির্জন আর নির্ভেজাল। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুমদ্বীপ ঠিক তেমনই এক জায়গা—যেখানে প্রকৃতি নিজের মতো করে বেঁচে আছে, আর মানুষ সেখানে অতিথি মাত্র।

এই যাত্রায় আমার সঙ্গে ছিলেন আমার বড় ভাই, সহযোদ্ধা ও সহকর্মী, সহপাঠী মুশফিকুর রহমান রুবেল। ভ্রমণটা শুধু ঘোরাঘুরি নয়—ছিল আমাদের দু’জনের কনটেন্ট তৈরির এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। রুবেল তার নিজস্ব স্টাইলে ভিডিও ও গল্প ধারণ করছিল, আর আমিও সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখছিলাম—প্রকৃতি আর বাস্তবতার একসঙ্গে গল্প বলার চেষ্টা।

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকার সদরঘাট থেকে, সন্ধ্যা ছয়টার লঞ্চে। নদীর বুক চিরে ধীরে চলা লঞ্চ, দূরের আলো আর রাতের নীরবতা—সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পরদিন সকাল সাড়ে আটটার দিকে পৌঁছালাম হাতিয়ার তমুর উদ্দিন ঘাটে।

তারপর শুরু হলো ভাঙা-ভাঙা পথের গল্প—চৌমুহনী, জাহাজমারা বাজার, মোক্তারিয়া ঘাট… অটো, ট্রলার, আবার অটো। প্রতিটি ধাপে পথ যেমন কঠিন, তেমনি ভাড়ার চাপও কিছুটা বাড়তি। তবুও সামনে ছিল নিঝুমদ্বীপ—যে নামটাই এক ধরনের টান তৈরি করে।
বিকেলের দিকে পৌঁছে দেখি, দ্বীপের বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা। হোটেল সীমিত, রাস্তা কাঁচা আর ভাঙাচোরা—চলাচল সহজ নয়। তবুও এই অপ্রতুলতার মাঝেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সৌন্দর্য।

বিকেলে আমরা ১০-১২ জন মিলে একটি ট্রলার ভাড়া করি। নদীর বুক, চর, আর হঠাৎ দেখা পাওয়া অসংখ্য হরিণ—মনে হচ্ছিল আমরা যেন প্রকৃতির কোনো গল্পের ভেতরে ঢুকে গেছি। রুবেল তখন ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত, আর আমিও সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
তবে এই সৌন্দর্যের মাঝেও কিছু কষ্ট চোখে পড়ে। হরিণের সংখ্যা অনেক, কিন্তু তাদের প্রাকৃতিক খাবারের সংকট স্পষ্ট। আমরা বিস্কুট আর রুটি দিলে তারা আগ্রহ নিয়ে খায়—দৃশ্যটা যেমন সুন্দর, তেমনি ভাবনারও।
চরাঞ্চল হওয়ায় মাছের প্রাচুর্য থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কম। বিশেষ করে ইলিশের মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও বাজারে দাম অনেক বেশি—যা আমাদের মতো ভ্রমণকারীদের অবাক করেছে।
রাত নামলে নিঝুমদ্বীপ যেন আরও নিঝুম হয়ে যায়। হোটেলের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায় হরিণের নীরব চলাফেরা। কোনো শব্দ নেই—শুধু প্রকৃতি আর তার নিঃশ্বাস।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি হোটেলের সামনে হরিণ ঘাস খাচ্ছে। এমন দৃশ্য শহরের জীবনে কল্পনাও করা যায় না। আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছি—কোনো ক্যামেরা, কোনো শব্দ ছাড়াই।

তবে পুরো ভ্রমণে একটা বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—মোবাইল নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে কিছু অপারেটরের কোনো সিগন্যালই পাওয়া যায়নি। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
সকাল ১১টার দিকে আমরা ট্রলারে করে নিঝুমদ্বীপ ছাড়লাম। দীর্ঘ নদীপথে চলতে চলতে ট্রলারে রান্না করা মাছ খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্নধর্মী। এরপর চেয়ারম্যান ঘাট, নোয়াখালী সদর, আর শেষে ঢাকা—ফিরে এলাম আবার ব্যস্ত জীবনে।

নিঝুমদ্বীপ শুধু একটি জায়গা নয়—এটা এক অনুভূতি। এখানে যেমন আছে প্রকৃতির ভালোবাসা, তেমনি আছে মানুষের সংগ্রামের গল্পও।
সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই দ্বীপে এক অদ্ভুত টান আছে—যা মানুষকে আবারও ফিরে যেতে ডাকে।