।। আল আমিন মুক্ত।।
‘পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে সারাদিন মাঠে টোটো করলে জিপিএ-৫ আসবে কীভাবে?’—বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই বিকেলবেলা কোনো না কোনো অভিভাবকের মুখ থেকে এই ধমকটি শোনা যায়। আমাদের দেশের জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘পড়াশোনা’ বলতে আমরা শুধু বোঝাই মুখস্থবিদ্যা আর খাতার পর খাতা লিখে আসা। সেখানে সন্তান মাঠে খেলতে যাওয়া মানেই বাবা-মায়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। খেলাধুলাকে এ দেশে দেখা হয় স্রেফ সময় নষ্ট ও পড়াশোনার শত্রু হিসেবে। কিন্তু আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স বা চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে? স্পোর্টস কি আসলেই বাচ্চাদের একাডেমিক পারফরম্যান্সের ক্ষতি করে?
ক্যাটালোনিয়ার ১,৫২৪ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর পিআইএসএ (PISA) ডেটা ব্যবহার করে সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষক ই. রোইগ-হিয়েরো এবং তাঁর সহকর্মীদের (২০২৫) একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা আমাদের এই সনাতন ভাবনার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। এই গবেষণার মূল প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: শারীরিক ব্যায়াম পড়াশোনার শত্রু নয়, বরং পরিমিত মাত্রায় এটি বাচ্চার মেধা বিকাশের মোক্ষম চাবিকাঠি; তবে তার অতি-ব্যবহার ডেকে আনতে পারে একাডেমিক বিপর্যয়।
গবেষণার তথ্য প্রমাণ করেছে যে, যে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে ২ থেকে ৫ বার মাঝারি ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলা করে, তারা গণিত, বিজ্ঞান এবং ভাষা—সব বিষয়ের পরীক্ষায় অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক ভালো স্কোর করেছে। বিশেষ করে, যারা সপ্তাহে ৩ দিন মাঠে কাটায়, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল ছিল সবচেয়ে চমৎকার। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করলে বাচ্চার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং ‘বিডিএনএফ’ (BDNF) নামক নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর নিঃসৃত হয়, যা বাচ্চার মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও গাণিতিক যুক্তি সমাধানের ক্ষমতা অলৌকিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, যে মাঠকে অভিভাবকেরা মেধার শত্রু ভাবছেন, বিজ্ঞান বলছে তা আসলে মেধা শাণিত করার এক অদৃশ্য ল্যাবরেটরি।
তবে গবেষণার অন্য দিকটি বাংলাদেশের অভিভাবকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে ৬ দিন বা তার বেশি অতিরিক্ত ব্যায়াম বা স্পোর্টস নিয়ে মেতে থাকে, তাদের ফলাফল সব ক্ষেত্রেই সবচেয়ে নিম্নমানের বা খারাপ এসেছে। ঠিক এই জায়গাতেই খেলাধুলা বাচ্চার পড়াশোনার ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত খেলাধুলা বা ভারী শারীরিক কসরত বাচ্চার শরীর ও মনকে স্থায়ীভাবে ক্লান্ত (Fatigue) করে ফেলে। ফলে মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করার সুযোগ থাকে না এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তি ও সময় অবশিষ্ট থাকে না।
আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে শহর অঞ্চলের ফ্ল্যাট সংস্কৃতির মধ্যবিত্ত অভিভাবকেরা বাচ্চাকে সারাদিন চার দেয়ালে বন্দি করে কোচিং আর প্রাইভেটের চক্রব্যূহে আটকে রাখছেন। মাঠের অভাবে বা পড়াশোনার চাপে আমাদের বাচ্চারা হয়ে পড়ছে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা অলস। অন্যদিকে, গ্রামের দিকে বা যারা বিভিন্ন স্পোর্টস একাডেমিতে ভর্তি হচ্ছে, তারা অনেক সময় পড়াশোনাকে পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে দিন-রাত শুধু মাঠেই পড়ে থাকছে। এই দুই ধরণের চরমপন্থা (Extremism) বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর।
পাশাপাশি, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের চিত্রটি আমাদের দেশের জন্য আরও রূঢ়। গবেষণায় দেখা গেছে, ছাত্রীদের মাঝে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকার প্রবণতা ছাত্রদের চেয়ে দ্বিগুণ, কারণ আমাদের সামাজিক কাঠামো মেয়েদের মাঠে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। খেলাধুলা যেহেতু মেধা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার, তাই ছাত্রীদের স্পোর্টস থেকে দূরে রাখা প্রকারান্তরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকেও এক ধরণের বৈষম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের করণীয় কী? ক্যাটালোনিয়ার এই গবেষণা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক মানসিকতার আমূল পরিবর্তনের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক রূপরেখা দেয়।
প্রথমত, অভিভাবকদের মানসিকতার দেয়াল ভাঙতে হবে। সন্তানকে সারাদিন ঘরে বন্দি করে শুধু মুখস্থ করানো যেমন ভুল, তেমনি তাকে অতিরিক্ত স্পোর্টস একাডেমিতে পাঠিয়ে ক্লান্ত করে ফেলাও মস্ত বড় ভুল। বাচ্চাকে সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ দিন বিকেলে মাঠে খেলতে দেওয়া বা মাঝারি ব্যায়াম করতে দেওয়া উচিত। এতে পড়াশোনার ক্ষতি তো হবেই না, বরং তার ক্লাসরুমের পারফরম্যান্স আরও উজ্জ্বল হবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত প্রথাগত অলস বসে থাকার ক্লাসের বদলে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ‘অ্যাক্টিভ ব্রেক’ বা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শেখার কৌশল (Physical Active Learning) কারিকুলামে বাধ্যতামূলক করা। একই সাথে ছাত্রীদের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রীড়া পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
খেলার মাঠ আর ক্লাসরুম—এ দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মাঠ আর মেধা একে অপরের শত্রু নয়, বরং পরম মিত্র। এই দুইয়ের মাঝে একটি সুন্দর বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যারা শারীরিকভাবে ফিট এবং মানসিকভাবে যেকোনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের নাম উজ্জ্বল করার যোগ্য।
লেখক পরিচিত : আল আমিন মুক্ত
শিক্ষার্থী (স্নাতকোত্তর)
শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
Email :muktopess@gmail.com