বেরোবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ঈদুল আজহা: ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির অনন্য বার্তা

মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬

 

মাসফিকুল হাসান, বেরোবি প্রতিনিধি;

ত্যাগ, সহমর্মিতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষায় ভরপুর পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি এই ঈদ আমাদের শেখায় নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করতে, অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করতে এবং সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদুল আজহাকে ঘিরে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভিন্নধর্মী আবেগ, উপলব্ধি ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। এবারের ঈদুল আজহা উদযাপন নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক মাসফিকুল হাসান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করেন, ঈদুল আজহা কেবল আনন্দের উৎসব নয়; এটি একটি গভীর দার্শনিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রতীক। কোরবানির ইতিহাসে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত, তা মানবজীবনের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। এই ত্যাগের চেতনা শুধু পশু কোরবানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজেদের ভেতরের লোভ, অহংকার, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়ন করা সম্ভব—এমনটাই মনে করেন শিক্ষার্থীরা।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মালেক বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। তাই ঈদের সময় বাড়ি ফেরা আমাদের জন্য এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি। পরিবারের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তখন অনেক বেশি মূল্যবান মনে হয়।”

তবে শুধুমাত্র পারিবারিক আনন্দেই সীমাবদ্ধ নয় শিক্ষার্থীদের ভাবনা। তারা ঈদুল আজহার সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের দিকেও আলোকপাত করেছেন। তাদের মতে, কোরবানির মাংস সঠিকভাবে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই এই ঈদের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ বলেন, “আমরা অনেক সময় কোরবানিকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখি। কিন্তু এর একটি বড় সামাজিক দিক রয়েছে। যদি আমরা সঠিকভাবে কোরবানির মাংস বণ্টন করি, তাহলে সমাজের অনেক অসহায় মানুষও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারে। সেটাই আসলে প্রকৃত ঈদের চেতনা।”

ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, আধুনিক জীবনের ভোগবাদী প্রবণতা অনেক সময় ঈদের প্রকৃত মূল্যবোধকে আড়াল করে ফেলে। অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত খরচ এবং বাহ্যিক আড়ম্বরের কারণে ঈদের আসল উদ্দেশ্য অনেক সময় হারিয়ে যায়। তাই তারা এই উৎসবকে আরও অর্থবহ ও মানবিক করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “ঈদুল আজহা আমাদের শেখায় সংযম ও ত্যাগ। কিন্তু আমরা অনেক সময় সেটাকে প্রতিযোগিতার জায়গায় নিয়ে যাই—কে বড় পশু কোরবানি দিল, কে বেশি আয়োজন করল। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের উচিত ঈদের প্রকৃত শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া।”

দূরে থেকে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদুল আজহা আরও বেশি আবেগঘন হয়ে ওঠে। সারা বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা, ক্লাস, পরীক্ষা ও নানা দায়িত্বের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীরা এই ঈদকে ঘিরে পরিবারের কাছে ফেরার জন্য মুখিয়ে থাকেন। বাড়ির পরিবেশ, মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায়, কোরবানির প্রস্তুতি—এসবই তাদের কাছে ঈদের প্রকৃত আনন্দের অংশ।

ঈদুল আজহা শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্র। এই ঈদের মাধ্যমে মানুষ যদি নিজেদের আচরণ, চিন্তাভাবনা ও জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তবে একটি মানবিক, সহমর্মিতাপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বেরোবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় ঈদুল আজহা মানে শুধু উৎসবের আনন্দ নয়—বরং আত্মশুদ্ধি, ত্যাগের চেতনা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার এক মহৎ উপলক্ষ। এই মূল্যবোধগুলোই একটি সুন্দর সমাজ ও মানবিক পৃথিবী গঠনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।