।। মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কাজল ।।
এক-এগারোর সময়ে শেখ হাসিনা সমগ্র জাতিকে যখন লৈগা বৈঠা দিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এবং বলে এক-এগারো সরকার তার আন্দোলনের ফসল, তখন সরকারের মতি গতি দেখে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তারের ভয়ে লন্ডন হয়ে পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক উপদেশটা তাকে ডেঞ্জার লেডি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সমস্ত বিমান পরিবহনকে নিষেধ করেছিল যেন কেউ তাকে বহন না করে। তখন সে গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে যায়। এর আগেও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার সময়ও তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। তার পালানোর ইতিহাস অনেক পুরোনো। এবং সে পালায়, এটাই সত্য।
এভাবে এবার আসি সতেরো বছরের ইতিহাসে। দেশের জনগণ এবং বিএনপি-জামায়াতের সকল নেতৃবৃন্দ অত্যাচারের কথা তারা ভুলে যায় নাই। হত্যা ও গুমের কথাও তারা ভুলে যায়নি। কারণ তারা ঘরে থাকতে, বাড়িতে থাকতে পারেনি, ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরিবাকরি, ঘর-সংসার, সন্তান লালন-পালন করতে পারেনি। এগুলো এত তাড়াতাড়ি তারা ভুলে গেছে?
সরকারের এখন ছয় মাসও হয়নি। এখন আন্দোলন, এখনই কি সরকারের পদত্যাগ? এখনই কি মন্ত্রীর পদত্যাগ? এগুলো কিসের আলামত? এগুলো নিলক্ততা, এগুলো সহজেই অনুমেয় ও ষড়যন্ত্র ।
ঠিক আছে তো? আচ্ছা, জুলাইয়ের ঘটনাকে স্মরণ করে মনে রেখে, ধৈর্য ধরে দেশের স্বার্থে সবাইকে নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণে, সর্বজনের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থেকে আগামী দিনে সুন্দর রাষ্ট্র বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। না হলে আবার অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং দেশের স্বার্থে জুলাইযোদ্ধাদের রক্ত জলাঞ্জলি হবে। এতে কোনো সন্দেহ নাই।
এবার বেগম আসি খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে। যখন শেখ হাসিনাকে ভুলিয়ে এক-এগারো সরকার পাঠিয়ে দেয়, তখন আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রীকেও এক-এগারো সরকার পাঠিয়ে দেওয়ার পায়তারা করছিল। তখন বেগম খালেদা জিয়া দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দেন এক-এগারো সরকারকে, “আমি বিদেশে যাব না, বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।”
তারপর যখন বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করে চাপ দেয়, এবং বিদেশে পাঠাতে ব্যস্ত ছিল, তখন আমরা কয়েকজন ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে, খন্দকার বাবুল চৌধুরী বাদী হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। তখন তৎকালীন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহাব সাহেব রীট মামলাটি আমলে নিয়ে সাত দিনের রুল জারি করেন। হয়ে যায় বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়া স্থগিত এবং মামলায় তাকে সহযোগিতা করেন নজরুল ইসলাম খান, হাবিবুন নবী খান সোহেল, এম ইলিয়াস আলী, মোহাম্মদ শাহজাহান, অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, শামসুজ্জোহা, সেলিম রেজা হাবিব, ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ, ফরহাদ হোসেন আজাদ, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, শ্যামা ওবায়েদ, তৃণমূলের নেতৃবৃন্দ এবং আরো অনেকেই। আইনজীবী হিসেবে আমাদের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, জমিরুদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, হাবিবুর রশিদ হাবিব, মেজর মিজানুর রহমান (অবঃ), নজরুল ইসলাম নোমান এবং আশির দশকের সাবেক ছাত্রনেতৃবৃন্দ। কারণ আমরা তখন ম্যাডামের সঙ্গে নিয়মিত সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতাম।
ওই যাত্রায় বেগম খালেদা জিয়া দেশ ত্যাগ করতে হয়নি এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি নেতাকর্মীদের সাথে দেশেই অবস্থান করেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই সাহসিকতা দেখে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন এবং এক-এগারো সরকারের সাথে ষড়যন্ত্র করেন। দেশে এসেই বিমানবন্দরে ঘোষণা দেন যে এক-এগারো সরকারের সমস্ত অপরকর্ম-দোষ তিনি ক্ষমা করে দিবেন ও বৈধতা দিবেন।
তারই ফসল ২০০৯ সালের নির্বাচন এবং দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র। জাতি ভুলে নাই এক-এগারো ও এক-এগারো-পরবর্তী সরকারের ষড়যন্ত্র। তাই সকলকে ভেদাভেদ ভুলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
শেখ হাসিনা এখন লাফাচ্ছে, দেশে ফিরে আসবে। কিন্তু এটা তার দেশবাসীকে অস্থির করার একটি কঠিন ষড়যন্ত্র ও ধাপ্পাবাজি । সে যদি ১৭ বছরের ইতিহাস এবং অত্যাচারের কথা মনে করে, সেই ভয়েই সে পূর্বের ন্যায় এ ভুল করবে না। এবং সে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি।
তাই সরকার ও দেশবাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন, শেখ হাসিনার কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগী হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।
পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস বলে না, পলাতক আসামি দেশে ফিরে আসবে। কারন জুলাইয়ের রক্তের দাগ এবং গুম-খুনের কথা মানুষ এখনো ভুলেনি।
জনৈক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন হলে আমাদের সমস্ত লেখাপড়া, অর্জিত শিক্ষা ও অর্জন—সবই ভুল ছিল। (সলিমুল্লাহ হক খান)

লেখক: মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কাজল
সদস্য: ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।