বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা উন্মাদনা: ইতিহাস, আবেগ নাকি অতিরিক্ত আসক্তি?

শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২৬

 

আউয়াল চৌধুরী।। 

আমাকে দেখেই কার্লোস এবং জোসে মিটি মিটি হাসছে। কাছে গেলেই মোবাইল বের করে একটি ভিডিও দেখালো। দুজন আমার সহকর্মী। সম্পর্কও চমৎকার। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ মেসির গোল উদযাপন করছে। চারদিকে উল্লাস, পতাকা আর মানুষের ঢল। উত্তাল এই ভিডিও নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। মেসি গোল দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাধ ভাঙা জোয়ার তৈরি হয়েছে।

কৌতূহল নিয়ে- অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘এটা কোথায়?’ এক নজর দেখেই আমি বললাম, ‘বাংলাদেশের একটিবিশ্ববিদ্যালযয়ে।’

 

কার্লোস বিস্মিত হয়ে বলল, ‘একটি বিদেশি দেশের ফুটবল দলের জন্য মানুষ এতটা পাগল হতে পারে?’

 

আমি ওদের বললাম, এখানে এমন মানুষও আছে যে নিজের জমি বিক্রি করে কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানিয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি নীল-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এমনকি ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর মানসিক চাপ সইতে না পেরে কারও কারও মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। শুনে ওরা যতটা না অবাক, তার চেয়ে বেশি হতবিহ্বল। এরপর তাদের সঙ্গে ফুটবল ইতিহাস নিয়ে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়।

 

কার্লোস শুধু মাথা নেড়ে বলল, ‘অবিশ্বাস্য!’

 

সত্যিই তো-ফুটবল নিয়ে এমন উন্মাদনা পৃথিবীর আর কোনো দেশে খুব একটা দেখা যায় না। প্রশ্ন হলো, কীভাবে ঘটল এই উত্থান? উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে বহু বছর পেছনে।

 

ছোটবেলায় স্কুলের পাঠ‍্য বইয়ে আমরা পড়েছিলাম ফুটবলের কালো মানিক পেলের গল্প। সেখান থেকেই একটা প্রজন্ম ফুটবল আর ব্রাজিলকে ভালোবাসতে শেখে। ব্রাজিলের একের পর এক বিশ্বকাপ জয় সেই ভালোবাসাকে আরও পোক্ত করে। কিন্তু ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় সব হিসাব পাল্টে দেয়। ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্য মানুষকে এমনভাবে মুগ্ধ করে যে বিশাল এক ভক্তগোষ্ঠীর জন্ম হয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অসাধারণ গোল, ড্রিবলিং এবং একক নৈপুণ্য বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। ১৯৯০ আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে এসে সেই উত্থান পূর্ণতা পায়। মানুষ ভাগ হয়ে যায় দুই দলে, ঠিক যেমন আবাহনী-মোহামেডানের সমর্থকেরা ভাগ হতো। একজন বন্ধু ব্রাজিল সমর্থন করলে অন্যজন আর্জেন্টিনা বেছে নিত, নিছক সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনন্দেই। এভাবেই শুরু হয় পাড়ায় পাড়ায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ‘টুর্নামেন্ট’।

 

তবে আরেকটি প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি থাকে। পৃথিবীর এত দেশ থাকতে বাংলাদেশেই কেন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে এমন আবেগ গড়ে উঠল?

 

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে-

প্রথমত, বাংলাদেশীরা আবেগপ্রবণ জাতি।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে নিয়মিত অংশ নিতে পারেনি। তাই ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের আবেগ প্রকাশের জন্য একটি দল বেছে নিয়েছে। কেউ ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবলে মুগ্ধ হয়েছে, কেউ ম্যারাডোনা বা মেসির জাদুতে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছে। ধীরে ধীরে এই সমর্থন পারিবারিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ফুটবল শুধু খেলা নয়, এটি সামাজিক বন্ধনের একটি মাধ্যম। বিশ্বকাপ এলেই বন্ধুদের আড্ডা, চায়ের দোকানের আলোচনা, অফিসের তর্ক, রাত জেগে খেলা দেখা-সব মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ।

 

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি এই আবেগকে আরও বিস্তৃত করেছে। আগে একটি গোলের গল্প পরদিন পত্রিকায় পড়তে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গোল, ভিডিও, বিশ্লেষণ, মিম এবং উদযাপন ছড়িয়ে পড়ে কোটি মানুষের কাছে। ফুটবল এখন শুধু মাঠে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খেলা হয়।

 

ম্যারাডোনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আর্জেন্টিনার সেই আবেগ হয়তো কমে যাবে। কিন্তু লিওনেল মেসির আগমন সেই আবেগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তার অসাধারণ ফুটবল, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয় নতুন প্রজন্মকে আবার আর্জেন্টিনার সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে রোনালদো, নেইমার, রোনালদিনহো, কাকার মতো তারকারা ব্রাজিলের জনপ্রিয়তাও ধরে রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও আমি এই পার্থক্য স্পষ্ট দেখি। এখানে মানুষ খেলাধুলা ভালোবাসে, কিন্তু সেটিকে জীবনের একটি অংশ হিসেবেই দেখে। খেলা শেষ, আলোচনা শেষ, এরপর সবাই নিজের কাজে ফিরে যায়।

 

বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। বিশ্বকাপ এলেই গ্রাম থেকে শহর, ছাদ থেকে রাস্তা-সবখানে ফুটবল উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবাই এই আনন্দের অংশ হয়ে যায়। বিদেশিরা এই দৃশ্য দেখে বিস্মিত হন, কারণ এমন সামাজিক উন্মাদনা বিশ্বের অনেক দেশেই এখন আর দেখা যায় না।

 

তবে এখানেই একটি সীমারেখা টানতে হবে। সমর্থন আর অন্ধ সমর্থন এক জিনিস নয়। একটি খেলার ফলাফলের কারণে যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়, মারামারি হয় কিংবা কেউ নিজের ক্ষতি করে-মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটে তাহলে সেই আবেগ আর সুস্থ বিনোদন থাকে না।

 

ফুটবল আমাদের আনন্দ দেবে, মানুষকে এক করবে; বিভক্ত করবে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা নয়। কারণ বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় এক মাসে, কিন্তু মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং মানবিক মূল্যবোধ থেকে যায় সারাজীবন।

 

বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা বিশ্বের কাছে নিঃসন্দেহে বিস্ময়ের। এটি আমাদের আবেগ, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার একটি অনন্য প্রকাশ। তবে এই ভালোবাসা তখনই সবচেয়ে সুন্দর, যখন তার সঙ্গে থাকে সহনশীলতা, সম্মান এবং মানবিকতা।

কারণ শেষ পর্যন্ত ফুটবল একটি খেলা-জীবনের চেয়ে বড় নয়।

 

 

লেখক পরিচিত : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক